আরযু হ্যায় ম্যায় তুঝে দেখা কারু!



জান্নাত; পরম আরাধ্য একটি নাম। অশেষ এবং চিরস্থায়ী সুখময় জীবনের নিবাস পরম আরাধ্য হবারই কথা। একজন মুমিনের সারা জীবনকার স্বপ্ন এবং সাধনার গন্তব্য হলো কাঙ্খিত সেই “জান্নাত”। প্রেমাস্পদের পথচেয়ে প্রিয়তমের অস্থির প্রতিক্ষার মতো মুমিন তার ধ্যান-মন সব দিয়ে দাসত্বের নিষ্ঠতায় জান্নাতের আরাধনা করে যায়। সূরা কাহাফের একশো সাত নং আয়াতের ভাষ্যানুযায়ী সেই প্রতিক্ষিত জান্নাত ইমান ও নেক আমালের বিনিময়ে মুমিন তার প্রভুর পক্ষ থেকে উপহারস্বরূপ পেয়ে থাকেন। 

প্রসঙ্গতই কথার পিঠে কথার মতো মাথা তুলে জেগে ওঠছে একটি প্রশ্ন। একজন মুমিনের জন্য উপহারের নামে জান্নাতই কি সর্বোচ্চ আকর্ষণ, নাকি তাক লাগিয়ে দেবার জন্য আরো বাকি কিছু আছে? যদি জান্নাতের পরেও সর্বোচ্চ আকর্ষণ বলতে কিছু থেকে থাকে, তাহলে কি নিঃসন্দেহে আরাধনা এবং সাধনার কেন্দ্রবিন্দু তাইই হবার কথা নয়?

ধরাছোঁয়ার বাহিরে, শশুরালয়ে থাকা কন্যা যখন বহুদিন পরে বাবার বাড়ি আগমন করে, তখন নিশ্চয়ই এই আগমন বাবার বাড়ির ভোজনবিলাসের জন্য নয়! প্রিয় বাবার সোনামুখদর্শনই তখন মূখ্য হয়ে ওঠে। অথচ বাবার মুখদর্শনের পাশাপাশি ভোজনবিলাস পর্বও সানন্দেই সেরে যায়।

ঠিক তেমনই একজন মুমিন কখনো জান্নাত পেয়েই সন্তুষ্ট থাকার কথা  নয়। কেননা, তার জন্য অপেক্ষা করছে ভিন্ন কিছু। এমন কিছু, যা না কোনো দৃষ্টি কখনো দর্শন করেছে, আর না কোনো কর্ণ কোনোদিন শ্রবণ করেছে! বলতে কি, কোনো হৃদয়ও এমন নেই, যে হৃদয় তা অনুধাবন করতে পারে! জামে তিরমিজি'র ২৫৫২ নং হাদীসে রয়েছে এমনই এক সুসংবাদ! কী সেই সুসংবাদ, যা আমাদের পেয়ারা রাসূল (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) আমাদের দিয়েছেন? আসুন তবে শুনে আসি!

সুহাইব (রাঃ) থেকে বর্ণিত আল্লাহ্‌ তা‘আলার বাণী, “যারা মঙ্গলজনক কাজ করে তাদের জন্য রয়েছে মঙ্গল এবং আরো অধিক”- (সূরা ইউনুস,২৬)। এ আয়াতের ব্যাখ্যায় নবী করীম (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেছেন, জান্নাতীরা জান্নাতে প্রবেশের পর একজন আহবানকারী (ফেরেশতা) ডেকে বলবেন, তোমাদের জন্য আল্লাহ তা‘আলার নিকট আরো প্রতিশ্রুতি রয়েছে। তারা (জান্নাতীরা) বলবে, তিনি কি আমাদের চেহারা উজ্জ্বল করে এবং জাহান্নাম থেকে মুক্তি দিয়ে জান্নাতে প্রবেশ করাননি? ফেরেশতারা বলবেন, হ্যাঁ। তারপর পর্দা খুলে যাবে (এবং আল্লাহ তা‘আলার সাক্ষাৎ সংঘটিত হবে)। তিনি (রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) বলেন, আল্লাহ্‌র কসম! তিনি মানুষকে তাঁর সাক্ষাতের চেয়ে বেশি পছন্দনীয় ও আকাঙ্ক্ষিত কোন জিনিসই প্রদান করেননি।

সুবহানাল্লাহ! যখন রাব্বে কারীম নিজ হাতে নূরানিয়াতের পর্দা উন্মোচন করবেন, যখন ঐশ্বর্য আর মহিমার নেকাব আলগা করবেন, কুদরতি কারিশমা যখন খিলখিল করে ওঠবে, আড়মোড়া ভেঙে পালাবে সমূহ অবসাদ! সৌন্দর্যের পূজারী আমার আপনার মতো মনুষ্যের অবস্থা কেমন হবে তখন? মহাকালের মরুভূমে হারিয়ে ফেলা ক্ষুদ্র আংটির ন্যায় হারিয়ে যাবে আমাদের ভূত-ভবিষ্য-বর্তমান! কেটে যাবে রাতের পরে রাত, দিনের পরে দিন, শতাব্দীর পরে শতাব্দী! শতসহস্র বছর ধুলোয় মিশে যাবে সেই মোহাচ্ছন্নতায়! নবী ইউসুফকে (আ.) দেখে জুলেখাদের একটি শোভনীয় স্বপ্নীল সন্ধ্যা কেটে যাওয়ার মতো উড়ে যাবে সময়! হয়তো এমনই একটি সন্ধ্যার প্রতিক্ষায় নাম না জানা অজ্ঞাত কোনো কবি মনের আনন্দে বলেছিলেন- 

"জান্নাতও দোযখ সে ইয়া রাব কেয়া কারূ?
আরযু হ্যায় ম্যায় তুঝে দেখা কারূ"!

আমরা রোজকার মোনাজাতে আল্লাহর কাছে জান্নাতই চেয়েছি শুধু, অবশ্য এই চাওয়াটা সুন্নাতও বটে। কিন্তু কি ভেবে দেখেছি কখনো, যার কাছে আমরা কামনা করছি সুখের জান্নাত, যিনি এসব জান্নাতের মালিক, তাকেও চাওয়া যায়? সেই রবকে চেয়েছি কখনো, যার কাছে চাওয়াটাই মূখ্য? যখন সবকিছু ফানা হয়ে যাবে, মিসমার হয়ে যাবে চন্দ্র-সূর্য্য, নক্ষত্র-বৈভব, থাকবে শুধু তাঁরই চেহারা! সেই প্রেমময়, সেই অনন্ত-অপার্থিব চেহারা দেখতে পাবার আনন্দ কিবা আরাধনা আমাদের কতোটুকু? জান্নাতের পরেও এই যে রবকে দেখার আনন্দ, নেয়ামত হিসেবে এ কি জান্নাতের চেয়েও বড় কিছু নয়? আপন রবকে দেখাটাই কি পরমারাধ্যের বিষয় নয়? তা কি জান্নাতের চেয়েও প্রত্যাশিত হবার কথা নয়? 

আসুন, দুয়ায় হাত তুলি! ভিখিরি বেশে আঁচল পেতে দেই! প্রেমিকার কাছে তার প্রেমভিক্ষার মতো রবের কাছে তাঁর দিদার কামনা করি! আসুন বলি, ইয়া রাব! আপনি আমার হয়ে যান, আমাকে আপনার করে নিন! 


- ইসহাক নাজির। সকাল ০৯: ১৬ মিনিট।
- ২২শে জুন, রোজ সোমবার।

মন্তব্যসমূহ

এই ব্লগটি থেকে জনপ্রিয় পোস্টগুলি

এমন দরদি মালী কোথায় পাব খুঁজে

মাদকঃ একটি আলোকচিত্র

জলের গান