রাসূলকে (সা.) লেখা সেই ঐতিহাসিক চিঠি।


বিসমিল্লাহির রাহমানির রাহীম

“(নগণ্য অধম) ইসহাক-এর পক্ষ হতে মুহাম্মাদ আরাবী সা.এর নিবেদনে-”

সালামুল্লাহি ওয়াসালাওয়াতুহু আলাইকা ইয়া রাসূলাল্লাহ…

প্রিয়তম!
চৌদ্দশো বছরের ব্যবধান আজ আপনার আমার মাঝে। অবারিত মরু-বালুকা আর সাগর-নদীর দূরত্ব দু'জনায়। এই ব্যবধান ও দূরত্বের পরম্পরা বিস্মৃত সালাম নিবেদন করছি। কলঙ্কিত এই অধম উম্মতের সালাম নিন! এই থমথমে মেঘের, শুভ্রাকাশের- শুভেচ্ছা নিন! নিশিথের বেশুমার তারকারাজি আর শরতের অঝোরধারা পরিমাণ দরূদ আপনার প্রতি-গ্রহণ করুন ইয়া নাবীয়্যাল আমীন!

হে রাসূল! শত শত বছর পর অনেকটা অড়ম্বর করেই আজ আপনাকে আমার লিখতে বসা৷ লিখবো কী! নেফাকগ্রস্ত এই দিল আমার শোভন-মোহন বর্ণালী সব আয়োজনকেই ধূলিধূসর করে দিয়েছে। হৃদয়ান্দোলিত বর্ণাঢ্য শব্দ-বহর থেমে গেছে। দিলের ধারকান এবং প্রাণের কাহারবা নিথর-নির্লিপ্ত হয়ে গেছে। হয়ে যাবেই না কেনো? আপনার প্রভাব-প্রতিপত্তির জৌলুসে তো সেদিন গোটা জগতটাই মহাসমারোহে জোশে উঠেছিলো। আপনার আগমনী প্রহরে রইরই করে নেচে-গেয়ে উঠেছিলো চাঁদ-সেতারা। নির্বাক গাছপালার নিবেদন ছিলো নৈসর্গিক-ঈর্ষণীয়। কবি যে মিথ্যে বলেননি-

“পুলকে শ্রদ্ধা-সম্ভ্রমে ওঠে দুলিয়া দুলিয়া কাবা,
বিশ্ব-বীণায় বাজে আগমনী মার্হাবা!মার্হাবা”!!

তবু আপনাকে একটি চিঠি লেখার উৎকণ্ঠায় কেটে গেছে আমার কতো সঙ্গীন-সন্ধ্যা! কতো রাত যে কেটে গেছে শব্দালঙ্কার এবং উপমা-উৎপ্রেক্ষার তল্লাশে হন্যে হয়ে ঘুরতে ঘুরতে-এর সঠিক ইয়ত্তা জানা নেই হে প্রিয়! তথাপিও সারওয়ারে কায়েনাত বরাবর চিঠি লিখি, আমার সাধ্য আছে কীসে!

রাসূল! কেমন ছিলো আপনার রুখছার! কেমন ছিলো দেহাকৃতি! কেমন ছিলো আপনার চলন-বলন-উপবেশন এবং বাক্যালাপের আদা ও আন্দাজ- কালির কিতাব জুড়ে আছে তাঁর হাজারো বর্ণনা। এতদসত্ত্বেও শিল্প-সাহিত্যের পৃথিবীতে আপনার রূপের প্রতিবিম্ব আঁকতে ব্যর্থ হয়েছে সাহিত্য-কালি, বিফল তাবৎ শিল্পির তুলি! যথার্থ না হোক, আপনার রূপের যৎসামান্য বর্ণনাই আমায় পরিতৃপ্ত করে ছাড়ে। তৃষিত হৃদে তাই, আপনার সৌম্য-শান্ত মুখশ্রী দর্শনের তিয়াস আরো তীব্রতর হয়েছে। দিলদরিয়ায় উঠেছে মউজের পরে মউজ! ইশকের বেতাবী আর দীদারের বেক্বারারী আমার নিঁদ ছিনিয়ে নিয়েছে রাসূল!

আপনার পবিত্র নয়নযুগল, লালচে-সাদা গাত্রবর্ণ আর ঘন-সরু ভ্রুদ্বয়ের প্রতি আমার জাঁনেছার হোক!
আপনার স্বচ্ছ ও উজ্জ্বল দন্তরাজী, সুষম-প্রশস্ত ওষ্ঠাধর আর সীনা থেকে নিয়ে নাভী পর্যন্ত সরু-চিকন পশমী রেখার প্রতি আমার প্রাণোৎসর্গ হোক!
আপনার সর্বসত্তার প্রতি আমার মা-বাবা ভাই-বন্ধু সকলই কোরবান হোক ইয়া রাসূলাল্লাহ!

রাসূল! আপনি ছিলেন খাইরুল খালক এবং সৃষ্টির উৎস। আপনার অঙ্গজুড়ে ছিলো “নূরের ফোয়ারা”; যেনো ছিলো “আলোর মিনার”! আপনার মুখচ্ছবি জুড়ে ছিলো মা'সুমিয়্যাত! ঘন আঁধারেও “আলোর শামাদান” যেনো। নিরুপম শ্রেষ্ঠত্ব বুঝি টপকে টপকে পড়ছে সেখান থেকে। দর্শনমাত্রই আপনাকে পরখ করতে পারা যথেষ্ট ছিলো-"এ কোনো প্রতারকের চেহারা নয়"!

তবু পবিত্র সে চাঁদমুখের শানে, বিশিষ্ট মুশরেক উকবা ইবনে আবী মুঈতের “ধৃষ্টতাপূর্ণ” আচরণ , আমার ও আমাদের ভাবনা জুড়ে বিস্তৃত সবটুকু উজাড় করে দেয় । ঘটনার আকস্মিকতা  আমার বুকে সাহাবাদের মতোই এপার-ওপার তোলপাড় সৃষ্টি করেছিলো। ভেঙে খানখান হয়ে গিয়েছিলো গোটা কল্পজগৎ। অন্তরাত্মায় দ্বীপ শিখার প্রজ্বলন হয়েছিলো! বেদনাশ্রু আড়াল করেছিলাম সেদিন সকলের চোখ ফাঁকি দিয়ে, যেদিন প্রথম শুনেছিলাম উকবার এহেন গোস্তাখীর কথা। দুর্ভোগ উকবার জন্য! দুর্ভোগ তাকে নির্দেশদাতা বন্ধু উবাই ইবনে খালফে’রও! দুর্ভোগ! দুর্ভোগ!!

রাসূল! পঞ্চম শ্রেণীর উর্দূ বইয়ে প্রথম পড়েছিলাম আপনার প্রতি তায়েফবাসীর 'বর্বরোচিত' সেই ইতিকথা। আকাশ সেদিন কী করে পারলো এ দৃশ্য অবলোকন করতে! জমিনও কীভাবে 'সেহেন' করেছিলো এই যন্ত্রণা! আহ! কী মর্মন্তুদ! আহ! কী করুণ, কী নিদারুণ সেই কল্পনা, সেই বাস্তবতা!

চৌদ্দশো বছরের পর্দা উন্মোচিত হয়েছিলো সেদিন আমার চোখের তারায়! আমার হৃদয়ালিন্দে! পষ্ট দেখছিলাম, হতভাগার দল পথের দু'ধারে সারীবদ্ধ হয়ে আপনার উপর ইট-পাথরের বৃষ্টি বর্ষণ করছে। আঘাত সইতে না পেরে আপনার ক্ষণে ক্ষণে বসে পড়া, আপনার বাহুদ্বয় ধরে দাঁড় করিয়ে ফের নালায়েকদের পৈশাচিক আনন্দে মেতে ওঠা-সকলই আমায় কাঁদিয়ে ফিরছিলো। আপনি হয়ে পড়লেন লহুলাহান! আমি যায়েদ ইবনে হারেছার (রা.) বেশে, পাথর বর্ষণ-মুখে,আপনার সুরক্ষার তরে দাঁড়িয়ে পড়ছিলাম বারেবার। যেনো যায়েদ(রা.)কে নয়, আমাকেই করলো ওরা রক্তাক্ত-চৌচির! যেনো আপনাকে নয়,আমাকেই করে তুললো ক্ষত-বিক্ষত! আপনার কদম মোবারাক বরাবর ছুঁড়ে মারা প্রত্যেকটি পাথর প্রথমে যেনো আমারই বুকে ছুরি হয়ে বিঁধছিলো ইয়া রাসূল! সে থেকে আজব্দি তায়েফের ভয়াল সেই চিত্র স্মৃতিপটে ভেসে ওঠতেই দু'চোখে ঝাপসা দেখি। ব্যাথাতুর; হুঁ হুঁ করে ওঠে বুক। অসীম ভালোবাসি যে আপনাকে ! কেনো বাসবো না হে নাবী! এসব কষ্ট আপনি যে আমার জন্যই বরণ করেছিলেন জনমভর।

রাসূল! ভাবতে বড্ড কষ্ট হচ্ছে, যে কথা বলার নয়, তবু বলতে হচ্ছে আজ। আপনার বিনিদ্র রাতের কান্নাকাটি, হুসনে খুলুক আর তায়েফের রক্তক্ষরণের বিনিময়ে তিলে তিলে যেই ইমারাতে ইসলামীয়া গড়ে তুলেছিলেন, ঘৃণার বিনিময়ে আজ তা  ফেরকায় ফেরকায় নিলাম হয়ে গেছে। যেই প্রভাব-প্রতিপত্তি, ক্ষমতায়নের ভাবমূর্তি আর প্রাণোৎসর্গের নাজরিয়া আপনি উপস্থাপন করে গিয়েছিলেন,তার সামান্য বৈ কিছুই রয়নি অবশিষ্ট আর।

আজমী ভূখণ্ড তো আগে থেকেই পাপের প্রলেপে নিমজ্জিত ছিলো। বলতে ভয় হয়, খোদ আরব্য উপদ্বীপগুলোও আজ অকালের বাজারে নিজের চৌদ্দশো বছরের পরম্পরা বিকিয়ে দিচ্ছে আধুনিকতার নামে। নাম নিচ্ছি না, আপনার বড় কষ্ট হবে ভেবে। অন্যথায় এমবিএস খ্যাত প্রিন্সের কীর্তি-কারতূত শুনলে আপনার দিলে হয়তো, ব্যাথার উপশম আরো বেড়ে যাবে! কী না হচ্ছে তার এবং তাদের মাতাহাতে! আপনাকে নিদ্রায়মাণ রেখে, অগোচরে, হজ্বের মৌসুমে এক উটকো বে-আবরু  নর্তকীকে ডেকে এনে কন্সার্ট করানো,  তাদেরই আশ্রয়ে হিন্দুয়ানা হোলি উৎসবে তরুণ-তরুণীর প্রমোদলীলা এবং অন্যত্র কন্সার্টে গায়ক-সমর্থকের ‘কুবলা’ বিনিময়-সত্যিই আমাদের ভাবিয়ে তোলে।

এই আরবেরই অপর পিঠে, ধুমধাম-আড়ম্বরে এমন একজনকে রাস্ট্রীয় সর্বোচ্চ সম্মাননা দেয়া হলো, যে কিনা সেদিন কাশ্মীরে আমাদেরকে ঈদের নামাজটাও পড়তে দিলোনা। অথচ, তাকে নিয়েই তাদের ঈদের কোলাকুলি- সত্যিই আমাদের ঝাপসা ও ক্ষীণ চোখে অশ্রুর জোগাড় করেছে। যার বুকে ইসলাম-দ্রোহিতার উনুন জ্বলে, যে আমাদের জীর্ণ বুকে রাইফেল তাক করে, গুমশুদা বন্ধুকে ফিরে পাবার ন্যায়, তাকেই তারা বুকে টেনে নিয়েছে। কী করে শত্রুকেও বুকে বুক মিলিয়ে সাদরে সম্ভাষণ করতে হয়, আমরা তাদের থেকেই শিখে আসছিলাম, সেদিন ফের নতুন সংজ্ঞার তালিম নিলাম। ক্ষোভে ফেটে পড়েও কিছু বলতে পারিনি সেদিন। কারণ, তাদেরই মাটিতে শায়িত হে আমার প্রিয়! আপনার বাণী আমার টুটি চেপে ধরে বলেছিলো- "উহিব্বুল আরাব, লিআন্নি আরাবিয়্যু...."!!

জানেন রাসূল! আজ আপনার উম্মাতি বড়ই বে-বাস! কোথাও লাঞ্চিত হচ্ছে, কোথাও বঞ্চিত হচ্ছে। লাঞ্চনা আর বঞ্চনায় ভূ-লুণ্ঠিত  হচ্ছে দিনবদিন! কারণ, উম্মাতির ললাটে আজ 'জঙ্গীবাদে'র রাজ তিলক যে আছে! তবুও আমরা চৌদ্দশো বছরের রেওয়াজ মেনে ওমর-খালিদের পেছনে সারীবদ্ধ হই। পথের ডাকে, পথ পেরিয়ে "শানে কারাম" রক্ষার মিছিলে ঝাপিয়ে পড়ি! বাঁচি কিংবা শহীদ হই!!

রাসূল! আমার পরিচয় বড় বৈচিত্র! গান্দেগী আর শারমিন্দেগীতে পরিপূর্ণ! কোথাও আপনার দেখানো সরল রেখায় পা ফেলে পথের ডানে হাটি। কোথাও কপট বনে যাই। তবু আমি আশেক! আমি প্রেমিক! আমিও ভালোবাসি! আমার কালিমাবিধৌত ভালোবাসা নিবেদন করছি-গ্রহণ করুন রাসূল! এই গরিবের সালাম গ্রহণ করুন!

কৃতজ্ঞতায়,
আপনার কলঙ্কিত উম্মাত-
ইসহাক।
..................................

ইসহাক নাজির।
২১-১১-২০১৯ইং রোজ বৃহষ্পতিবার, সন্ধ্যে ০৭:৪২ মিনিট।

মন্তব্যসমূহ

এই ব্লগটি থেকে জনপ্রিয় পোস্টগুলি

এমন দরদি মালী কোথায় পাব খুঁজে

মাদকঃ একটি আলোকচিত্র

জলের গান