ব্যথার দান

ক্লাস ফোরের বইয়ে যতীন্দ্রমোহন বাগচীর ‘কাজলা দিদি’ নামে একটা কবিতা ছিল। আমি তখন মাদ্রাসার মক্তবে থ্রিতে পড়ি৷ শুধু ‘কাজলা দিদি’ কেন, ফোরের কোন কবিতা বা গদ্যের সাথে স্বাভাবিক অর্থেই আমার তখন পরিচিত হবার কথা না। খুবই দুর্বল স্মৃতির মানুশ আমি। বিবাদমান বয়েসের তাড়নায় এই সামান্য সময়ে আজ অনেক কিছুই ভুলে গেছি৷ তবু সেই কবিতাটা একটা করুণ সুর এবং কান্নার গোটা গোটা আখরে স্মৃতির পাতায় এখনো জ্বলজ্বল করছে। মনের দেয়ালে এমনভাবে সেঁটে আছে, চাইলেই যাকে মিটিয়ে দেওয়া যায় না। 


পনের বছরের সুদীর্ঘ পথ মাড়িয়ে আমি যখন ছোট্ট একটা বাগানের বিপরীতে দাঁড়ানো আমাদের সেই মক্তবের সাদা দেয়ালে ঘেরা ঘরটায় উঁকি দেই, তখন শৈশবের কিছু সোনালি মুখ দেখে আমি যেন গলে যাই। ওদের সাথে পড়তে পড়তে খেলতে খেলতে বইয়ের ওপর মাথা রেখে আমি ঘুমিয়ে পড়ি। অথচ প্রতিবার একটা কোমল ব্যথাময় কবিতার কণ্ঠ আমার সর্ব সত্তাকে নাড়া দিয়ে ওঠে। স্বপ্নের ঘুম থেকে জেগে দেখি কেউ পড়ছে কেউ খেলছে। আর একটা ছেলে...! একলা একা নিঃসঙ্গ বসে কবিতাটা আবৃত্তি করে চলেছে। দুপুরের নিস্তব্ধ নিরবতায় দূর বনের গহীন হতে ভেসে আসা ঘুঘুর ডাকের মতো করুণ সেই কণ্ঠস্বর। বেদনার গহনে কাঁদতে থাকা শিশুর মতো মায়া সেই কণ্ঠ চুয়ে পড়ছে৷ একটা অবুঝ শিশুর ক্রন্দনেও কী করে এত ব্যথা এত বেদনা থাকতে পারে–মনিরের কণ্ঠের ‘কাজলা দিদি’ না শুনলে এ হয়তো বোঝা যাবে না৷ 


আমরা সবাই তখন কিশোর৷ সবাই তখন অবুঝের মতো৷ আমাদের মধ্যে বসে গোল জোব্বা গায়ে আলোকিত চেহারার মনির আওড়াত “বাঁশবাগানের মাথার ওপর চাঁদ উঠেছে ওই, মাগো আমার শোলক বলা কাজলা দিদি কই”...? আমি এখনো সেই সেভাবেই শুনতে পাই ওর কাঁদো কাঁদো আবৃত্তি৷ ও কাঁপছে আর কাঁদছে কবিতার ভাষায়–এ দৃশ্য আজও মনে পড়লে আমি ক্লান্ত হয়ে উঠি৷ চরণের পর চরণ কবিতার শিরায় শিরায় এগিয়ে যেত মনির। কবিতার মর্মে মর্মে আমিও কোথায় যেন হারিয়ে যেতাম। এভাবে নিজেকে হারিয়ে ফেলার বেদনা এতটাই প্রকট হতো যে, ওর সাথে সাথে আমিও খুঁজতাম কবিতায় বর্ণিত কাজলা দিদিকে। দিদির হারিয়ে যাওয়ার ব্যথা আমাকেও ছুঁয়ে যেত মনে-প্রাণে। 


চোখের পানি আড়াল করে আমি গভীর মনোযোগে ওর কবিতা শুনে যেতাম। ও আমার এই অশ্রুজল না দেখলেও আমি ওর কণ্ঠের ব্যথাকে ঠিকই টের পেতাম। ওর দহন উপেক্ষা করার অনুমতি তাই আমার ছিল না৷ সত্যি বলতে এমন যন্ত্রণা নিয়ে কবিতা গাইতে আমি অদ্যাবধি আর কাউকে দেখিনি। অপরিসীম ব্যথা নিয়ে আবৃত্তি করা কবিতা যখন হৃদয়ের পথে পথে ঘুরেফিরে মনের জমিনকে মাসের পর মাস, বছরের পর বছর কান্নার লোনাজলে ভিজিয়ে রাখে, তখন তা ব্যথার গান না হয়ে আর যায় কই? 


মনিরের বাবা গত হয়েছিলেন ও সেই ছোট থাকতেই। পরিবারের দুঃখের জোয়াল কাঁধে নিয়ে দূর আরবে প্রবাসের ঘানি টানতে হয় ওকে। এই কয়েকদিন আগেই ও বলল বিগত তিন বছরে নাকি ও দেশেই ফেরেনি। কথাটা খুব মনে ধরেছিল। যেই আমি ঘরের বাহিরে তিনটে দিনের জন্যও থাকতে পারি না, সেখানে ও কী করে তিন তিনটা  বছর ধরে প্রবাসে বসে আছে, তা আমার জন্য প্রকৃত অর্থেই অভাবনীয় ব্যাপার। 


ক’দিন আগে বন্ধু খালেদকে নিয়ে একটা লেখা লিখেছিলাম৷ তাতে মনির মন্তব্য করেছিল আমার লেখা নাকি ‘অসাধারণ’। এই উপলক্ষ্যে মনিরকে আমি বলতে চাই, এটা আমার প্রতি তোর একটা সুধারণা ছাড়া যে আর কিছুই না, এ আমি ভালো করেই জানি, দোস্ত! অথচ তুই জানিস না, আমার লেখার যতটুকু উন্নতি-অগ্রগতি, যতটুকু প্রাপ্তি ও তৃপ্তি, আমার মনে হয় এর প্রায় অনেকাংশই তোর সেই কবিতার থেকে পাওয়া, এর অনেকাংশই সেই ব্যথার দান–তুই এ সত্যিই জানিস না। 


ফেসবুক মারফতে জানলাম আজ তোর জন্মদিন। দুআ রইল এই দিনটা জীবনে বারে বারে আসুক। ফিরে ফিরে আসুক হাজার বার। কাটুক বিষাদ, আসুক হর্ষ৷ তুই দেশে ফিরে এলে আমরা আবারো ঘুরে আসব মক্তবের সেই সোনালি দিনে। অতিতের অলি-গলিতে আমরা ঘুরব সেই হারিয়ে যাওয়া ‘কাজলা দিদি’র খোঁজে৷ 


তোকে ভালোবাসি সেই শুভ্র এহরামের জন্য। তোকে ভালোবাসি সেই মক্কার জন্য, মদিনার জন্য। তীর্থ যাত্রার মুসাফির তুই আমার সালাম গ্রহণ কর, বন্ধু! আমার কবিতার ভালোবাসা গ্রহণ কর! 


ইসহাক নাজির।

রাত ০৯:২৭ মিনিট। 

২৩.০২.২২ ইং, রোজ বুধবার। 

কুতুবখালি, যাত্রাবাড়ী।




মন্তব্যসমূহ

এই ব্লগটি থেকে জনপ্রিয় পোস্টগুলি

এমন দরদি মালী কোথায় পাব খুঁজে

মাদকঃ একটি আলোকচিত্র

জলের গান