এমন দরদি মালী কোথায় পাব খুঁজে

 


রায়বেন্ডের তরে জীবনকাল ওয়াকফ করার জন্য নাম লেখালেন তিনি। বিবির কাছে অনুমতি চাইতে এসে বললেন, “আপনার হক আপনাকে সম্পূর্ণরূপে বুঝিয়ে দেওয়া আমার পক্ষে কখনোই সম্ভব না। তাই নিজের হক ছেড়ে দিয়ে আপনি আমায় যদি রায়বেন্ডের জন্য অনুমতি দিতেন, অনেক ভালো হতো”। কথাটা আনুমানিক এমনই ছিল। দীর্ঘ পীড়াপীড়ির পর্ব শেষে বিবি সাহেবার অনুমতি পাওয়া গেল শেষমেশ। স্বামীর হক ছেড়ে দেওয়ার কষ্ট তবুও হয়তো খচখচ করে যাচ্ছিল বিবি সাহেবার বুকে। এই অনুমতি যে আর সব অনুমতির ন্যায় সীমিত ও সামান্য নয়, এ যে জীবনকালব্যাপী, তা আর বলার অপেক্ষা রাখে না। 

চূড়ান্ত হলো পরদিন সকালের নাশতা খেয়ে তিনি রায়বেন্ডের উদ্দেশে যাত্রা করবেন। সেই মোতাবেক সকালের নাশতার জন্য প্রস্তুতি নিচ্ছেন তিনি। একইসাথে ঘরের খোঁজে আজীবনের জন্য ঘরহীন হবার তাড়া। এমনই সময় নাশতার জন্য কালবিলম্ব না করে এই মুহূর্তে যেন তিনি বেরিয়ে পড়েন, এটাই হলো বিবির আকুতি। ঠিক বোঝা গেল না এর পেছনকার যথার্থ কারণ। একি স্বামীকে চিরতরে ঘর থেকে বের করে দেবার, নাকি স্বামীর স্বপ্নে নিজেকে সাজিয়ে নেবার? কেন এ আকুতি? গতরাতে যাকে মানাতে হাজারো কাঠখড় পোহাতে হলো, সেই তিনিই কিনা সকালে উঠে স্বামীকে পীড়াপীড়ি করছেন তৎক্ষণাৎ বেরিয়ে পড়ার পক্ষে। ঘটনায় আশ্চর্যান্বিত হয়ে ‘তিনি’ বললেন, “ব্যাপার কী? গতরাতে তো এর পুরোপুরি ভিন্নতা ছিল আপনার মধ্যে। অথচ আজ অভিযোগের পরিবর্তে আপনার কণ্ঠে আকুতি? কী হলো আপনার”? 

এখন বিবি সাহেবা আসল কথাটি পাড়েন। বলেন, গতরাতের স্বপ্নে দেখা এক আজব ঘটনার কথা। তিনি দেখেন, জান্নাতী রমনীদের সরদারনি রাসূলুল্লাহ সা.-এর কলিজার টুকরা ও নয়নের মণি, সাইয়্যিদুনা হযরত আলী মুরতাজা রাযি.-এর স্ত্রী এবং আদরের দুলাল সায়্যিদুনা হযরত হাসান ও হুসাইন রাযিয়াল্লাহু আনহুমার শ্রদ্ধেয়া আম্মাজান ফাতিমা রাযিয়াল্লাহু আনহা এসেছেন তার কাছে। তাকে সম্বোধন করে বলছেন, “তুমি কি চাওনা যে মৃত্যুর পর তুমি আমাদের কাছে এসে থাকো”? বিবি সাহেবা প্রত্যুত্তর করলেন, “জি, অবশ্যই”। এর প্রেক্ষিতে সাইয়্যিদা ফাতিমা রাযি. বলেন, “তাহলে তোমার স্বামীকে তুমি আল্লাহর জন্য যেতে দিচ্ছ না কেন”? 

পিশাওয়ারের পাঠানদের সাথে থাকতে অনেককিছু শুনতাম তাঁকে নিয়ে। তাঁর ব্যাপারে কথা উঠলেই পাঠান বন্ধুদের চোখে আলোর ঝিলিক দেখা যেত। যতই শুনতাম, ততই ভালো লাগত আমারও। বহু আগে–যখন তাঁকে চেনার মতো বয়স হয়নি আমার–বিশ্ব ইজতেমায় তাঁর কিছু বয়ান শুনলেও চোখের দেখা হয়নি কখনো। পাঠানদের মুখে তাঁর আত্মত্যাগ ও কুরবানির রহস্যময় গল্পগুলো শুনতে শুনতে তাঁর পরলোকগত আত্মার প্রতি আমার ভিন্নরকমের ভালোবাসা ও মুহাব্বাত জাগ্রত হতো। তাই তাদের সাথে কথায় কথায় তাঁর কথা উঠলেই একটা আশ্চর্যরকমের সুকুন ও প্রশান্তি আমি অনুভব করতাম ভেতর থেকে। কারো পক্ষে সেই প্রশান্তি ও ভালোবাসার নমুনা খুব কমই অনুভব করেছি আমি। তিনি যে আর কেউ নন। তিনি পাকিস্তানের বিশ্ব আমির হাজি আব্দুল ওয়াহহাব সাহেব রাহিমাহুল্লাহ। 

একবার পাকিস্তানি বন্ধুদের দু-তিনজনের সাথে আমি গাড়িতে বসা। সবাই চুপচাপ। নিরবতা ভেঙে আমাদের আমির সাহেব ভাই হুমায়ুন বাবরকে আমি অনুরোধ করলাম হাজি সাহেবের স্মরণে কিছু তাজকেরা করতে। তৎক্ষণাৎ তিনি বলতে শুরু করেন উল্লিখিত ঘটনাটি। যেন এমনটাই চাচ্ছিলেন তিনি। হাজি সাহেবের এমন আত্মত্যাগের কাহিনি তারা শুনেছেন রায়বেন্ডের অন্য কোনো মুরুব্বির মুখে। সেই মুরুব্বির বরাত দিয়েই অনর্গল তিনি গল্পটি করে যান। 

ঈদের দিনও বাড়ি যেতেন না হাজি সাহেব। সাথীরা বলে-কয়ে ফুসলিয়ে-ফাসলিয়ে বাড়ী পাঠিয়ে দিলেও খনিকের তরে দেখা দিয়ে চলে আসতেন আবার। উম্মাহর দরদ আর হিদায়াতের তড়প বুকে নিয়ে সারাক্ষণ গম্ভীর হয়ে থাকতেন। খেতেন না দিনের পরে দিন। রাতের পরে রাত। একবার দু-তিনদিন হয়ে গেল তিনি কিছু মুখে নিচ্ছেন না। খাদেম যতবারই খাওয়ার কথা বলেন, ততবারই তিনি ক্ষুধা নেই বলে ফিরিয়ে দেন তাকে। একবার অপারগ হয়ে খাদেম এসে বললেন, “কেন খাচ্ছেন না, হাজি সাহেব? সামান্য কিছু হলেও খান। নইলে তো অসুখ করবেন আপনি”! হাজি সাহেব খুব রাগ পেয়ে যান তখন, “ওদিকে উম্মত জাহান্নামে যাচ্ছে, কারো কোনো খবর নেই। সবার শুধু আমার খাওয়া নিয়ে চিন্তা”। 

সেদিন খাদেমের প্রচণ্ড পীড়াপীড়ি আর কান্নাকাটি দেখে খেতে বসেন হাজি সাহেব। তাও রুটি খান এক-আধটি কেবল। এই ছিলেন আমাদের হাজি সাহেব রাহিমাহুল্লাহ। যিনি আমাদের হিদায়াত ও নাজাতের কথা ভাবতে ভাবতে খাবার-দাবার ছেড়ে দিয়েছিলেন দুই-তিনদিন, যাকে আল্লাহর জন্য উৎসর্গ করার পরামর্শ দিয়েছিলেন খোদ সাইয়্যিদা ফাতেমা (রাযি.) এসে, যার এবং যাদের আত্মত্যাগ, কুরবানি ও মেহনতের বদৌলতে আজ আমরা টিকে আছি, বিশ্বের দিগদিগন্তে ছড়িয়ে পড়েছে নবিওয়ালা এই মেহনতের যুগান্তকারী আহ্বান, এমন দরদি মালী কোথায় পাব খুঁজে!? 


ইসহাক নাজির 

রাত ০১ টা বেজে ৪৯ মিনিট 

৩১ শে জানুয়ারি, ২০২৫ ইং, শুক্রবার

টঙ্গী ময়দান, গাজীপুর

মন্তব্যসমূহ

এই ব্লগটি থেকে জনপ্রিয় পোস্টগুলি

মাদকঃ একটি আলোকচিত্র

জলের গান