পৃথিবীতে হয়তো সন্ধ্যে...

দরোজা খুলতেই চমকে উঠলো আফরা, "তুমি"?

প্রাণোচ্ছলতায় ভরপুর সদা সুহাসিনী এক তরুণী দাঁড়িয়ে আমার সামনে। আমার আফরা। বাবার দেয়া 'আফরা আঞ্জুম'। কুদরতের শৈল্পিক হাতে খুবই নিপুণভাবে সাজানো হয়েছে ওকে। মুখময় সে কী মায়া! তাই আমি ওর নাম দিয়েছি 'মায়াবী'।

জ্ঞানের তীব্র আকুলতা যেমন আছে ওর ভেতর,তেমনি আছে  খোদা-প্রেমের তপ্ত  তিয়াসও। অবসরের সময়টাকে হেলায় হারানোর মতো নয় সে আদৌ। সময় পেলেই কুরআন কিংবা বিবিধ বইয়ের জ্ঞান-সরোবরে ডুব দিয়ে যায়।

সেদিন প্রয়োজনীয় কিছু কাজ সেরে বাসায় ফিরতে গভীর রাত হয়ে গেছে। পথরোধ করে দাঁড়িয়েছিলো হঠাৎ বৃষ্টি। সামান্য বর্ষণেই মেঘে মেঘে ছেয়ে গেছে আকাশ। চাঁদ যেনো ঢাকা পড়ে গেছে সেই মেঘরাজ্যের আড়ালে। অন্ধকার রাতে পুরোদস্তুর ভিজে গেছি আমি। কাকভেজা যাকে বলে, ঠিক তাইই। বাসায় ফিরতেই দেখি, জায়নামাযে বসে কুরআন তিলাওয়াতে মগ্ন আফরা। আমাকে দেখে তিলাওয়াত শেষ করে কাছে এসে বললো,"এতো রাত করলে যে? ফোনটাও সুইচঅফ করে রেখেছো"।
আমি বললাম,"বাহিরে প্রচন্ড বৃষ্টি। তাই আটকা পড়ে গিয়েছিলাম। আর ফোনটাও দু'দিন যাবৎ সমস্যা করছে"।
"বাবা কতোবার বলেছে একটা গাড়ি কিনে দেবে। তা তো তুমি শুনবাই না,অথচ কষ্ট করে আসতেই  তোমার বেশি আনন্দ"।

আফরার বাবা সমাজের একজন সম্ভ্রান্ত এবং বিশিষ্ট ব্যবসায়ী। তিনি আমার দু হাতে তার মেয়েকে তুলে দিয়ে শূন্য হাত দুটো ভরে দিয়েছেন। ভরপুর এই হাতে কৃতজ্ঞতা আদায় করা ছাড়া কিছু নেয়ার মতো সামর্থ নেই আমার। তাই আমি প্রসঙ্গ পালটে বললাম,"ভাত খেয়েছো"?
"তুমি জানো না,তোমাকে ছাড়া আমি খাবো কিনা"?
"তার মানে এতোক্ষণ তুমি 'ভূখা' ছিলে"?
"আর নয় তো কি,খেয়েদেয়ে শুয়ে থাকবো"? বলেই কপট অভিমানে মুখ ঘোরালো ও।
আমি বললাম,"আচ্ছা ঠিকাছে,আমি ফ্রেশ হয়ে আসছি,তুমি খেতে আসো"।

রাতের খাবার শেষে বিছানায় গড়াতেই ঘুমে কাদা হয়ে গেলো আফরা। আমি অবাক দৃষ্টে লক্ষ্য করলাম, একটু আগেই মেঘের বুকে হারিয়ে গেলো যে চাঁদ, সে তো আমার ঘরের বিছানায়! ঘরময় আমার চাঁদের আলো! কী পবিত্রতা সেই চেহারায়! আমার কেবলই মনে হচ্ছিলো,এমন মুখপানে চেয়ে থেকেই একটা মানবজনম অনিমেষে পার করে দেয়া যায়। মনে পড়ে, রবী বাবু হয়তো এমনই নিষ্পাপ কোনো মুখের দিকে তাকিয়ে থেকে বলেছিলেন,

"দেখিনু তারে উপমা নাহি জানি,
ঘুমের দেশে স্বপন একখানি!
পালঙ্কেতে মগন রাজবালা,
আপন ভরা লাবণ্যে নিরালা"!

অথচ আমার সামনে দাঁড়ানো আফরা,আর পূর্বের সেই আফরার মাঝে দিবানিশির ফারাক। উজ্জ্বল-গৌরবর্ণ চেহারায় সেই প্রাণের চঞ্চলতা আর নেই। মাতৃত্বের সুবাসে আলোড়িত হলেও চোখের নিচের কালো দিগন্তরেখা জানান দিচ্ছে- আজ সে বড়ই ক্লান্ত। তার অস্তিত্বের মূলে যে সত্ত্বার বাস,প্রত্যহ তার অবুঝ লাথিতে খানিক উদ্ভ্রান্ত  আর বেসামাল সে।

আমি সালাম বিনিময় করে বললাম,"দরোজা ধরে দাঁড়িয়েই থাকবে নাকি ভেতরেও ঢুকতে দেবে"?
আফরা বললো,"তোমার না এক সপ্তাহের সফর ছিলো চিটাগাংয়ে? তিনদিনেই চলে এলে যে"?
আমি খাটে বসতে বসতে বললাম,"করোনার প্রকোপ দিনদিন বাড়ছে। তাই আমাদের চিটাগাংয়ের চারটে মিটিংয়ের তিনটাই ক্যান্সেল করতে হয়েছে"।

করোনার কথা শুনে ওর মুখ আরো কালো হয়ে গেলো। এই করোনায় ও বড্ড ভয় পেয়ে গেছে। দেশ-দেশান্তরের সীমারেখা পেরিয়ে এই মহামারি বাংলায় যেভাবে হামলে এসেছে,ভাবতেই গা শিউরে উঠছে।

২]

আমি বসে আছি মসজিদের সাথে লাগোয়া ইমাম সাহেবের কামরায়। ইমাম সাহেব মাওলানা আব্দুল হামীদ কাকা ষাটোর্ধ এক প্রৌঢ়। ছিমছাম পরিপাটি তার সেই কামরায় আসবাব বলতে তেমন কিছুই নেই। বিবাহিতা এক মেয়ে এবং স্ত্রীকে নিয়েই এই কামরার মতোন খাঁখাঁ তাঁর জগৎ। ইমামতি ছাড়া পরিবার চালানোর জন্য আয়ের দ্বিতীয় কোনো উৎস নেই তাঁর।

কথোপকথনের এক পর্যায়ে তিনি বললেন,"দেশ-বিদেশের যা অবস্থা,তাতে মনে হয়না টিইকা থাকতে পারুম।বিদেশের মতোন এহন বাংলাদেশেরও পরিস্থিতি খুব খারাপ। শুনতাছি স্কুল-কলেজ বন্ধ কইরা দিসে সরকারে"।
আমি বললাম,"শুধু স্কুল-কলেজ কেনো,অফিস-আদালত এমনকি গার্মেন্টসও বন্ধ ঘোষণা করা হয়েছে"।
ইমাম সাহেব পিলে চমকানোর মতো বলে উঠলেন,"কিহ! তাহলে তো বাংলাদেশের অবস্থাও খুব ভয়াবহতার দিকে যাইতাছে"।
"জি,বাংলাদেশে এখন পর্যন্ত ৫জন মারাও গেছে। আস্তে আস্তে যখন আরো বেড়ে যাবে,তখন কী ভয়ংকর হবে পরিস্থিতি,ভেবে দেখেছেন কাকা? তার উপর আবার মসজিদের নামাজে বেশি মানুষ আসতে নিষেধ করা হচ্ছে। কিন্তু মুছল্লী এখন যেই হারে বেড়ে গেছে,তাতে মনেই হয়..."!

আমাকে মাঝপথে থামিয়ে দিয়ে ইমাম সাহেব বললেন,"ঐ কথা বলতে হয় না বাবা! আল্লাহ যেনো কখনোই অমন দিন না দেখান। সবকিছু ঠিক হইয়া যাইবো,ইনশাআল্লাহ"।
আমি চুপ মেরে গেলাম। শুধু মনে মনে বললাম,যদি আপনার কথাই সত্যি হতো কাকা! যদি আপনার কথাই সত্যি হতো!!

মা'র শরীরটা বিশেষ ভালো না। বুকের ব্যাথাটা হঠাৎ বেড়েছে। তিনদিন যাবৎ ব্যাথায় কোঁকাচ্ছেন তিনি। এই বয়সে এসে কোনোরকমের চিকিৎসা নিতে তিনি নারাজ। তাঁর নিষেধাজ্ঞা উপেক্ষা করে চিকিৎসা-দাওয়াই চলছে অবিরত। অথচ চিকিৎসার জন্য তেমন অর্থেরও যোগান দিতে পারছি না আমি।যা করার,সব করছে আমার বড় বোন সাদিয়া আপু আর ভগ্নীপতি খন্দকার ইকরাম।

দু'দিনের মধ্যেই সুস্থ হয়ে উঠলেন মা। কিন্তু এখনো সুস্থ হলো না পৃথিবীর পরিস্থিতি। প্রতিদিন হাজারো মানুশ মারা যাচ্ছে। বিদেয় নিচ্ছে এই বিপুলা পৃথিবীর মায়া ত্যাগ করে।যেনো  বাংলাদেশের সামনেও আজ ঘোর অমানিশা দাঁড়িয়ে।প্রত্যহ আক্রান্তের তালিকা ক্রমশ প্রলম্বিত হচ্ছে। আজকের তালিকা তার আগের দিনকে ছাপিয়ে যাচ্ছে।

আসরের আগে মসজিদের মাইকে অকস্মাৎ এক ঘোষণা শুনে বজ্রাহতের মতোই জমে গেলাম। মুয়াজ্জিন সাহেবের কণ্ঠে শোনা গেলো,"প্রিয় এলাকাবাসী! অত্যন্ত দুঃখের সাথে জানানো যাচ্ছে যে,মসজিদে এখন থেকে আযান হলেও জামাত হবে না।এটাই সরকারী নির্দেশ। অতএব,আপনারা সবাই বাসায় নামাজ আদায় করুন।কেউ মসজিদে আসবেন না এবং বাহিরেও বের হবেন না"! ঘোষণা শুনে আমি আর আফরা সমস্বরে বলে উঠলাম,"এমন দিনও দেখার ছিলো"!

পরোক্ষণেই ওর চোখ চিকচিক করতে লাগলো। আমি জানি এখানে আর বসে থাকা যাবে না। নইলে ওর চোখের জলে আমাকেও ভাসতে হবে। আমি তৎক্ষণাৎ বাইরে বেরিয়ে পড়লাম।

৩]

বোধকরি জীবনের প্রথম, জুমার পরিবর্তে আদায় করলাম জোহরের নামায। একসাথে জামাত করবো নিয়্যাত করেছি আমরা। জায়নামাযে দাঁড়িয়েছি তবু আমার ভেতরে বয়ে যাচ্ছে উথালপাথাল ঢেউ। যে ঢেউ হৃদয়রাজ্যের সবকিছু ভেঙে তোলপাড় করে ভাসিয়ে নিতে জানে। ভেতরে একবুক হাহাকার চেপে বাহিরে আমি ঠিক ততোটাই সতেজ;সপ্রতিভ।

এমনি সময় পেছন থেকে আফরার ফোঁপানির শব্দে সম্বিত ফিরে পেলাম। মেয়েরা একটু তরলই হয়। আবেগে ফেটে পড়লে থামানো মুশকিল। ভাবলাম,কাঁদুক! ভাসিয়ে দিক সব! নামাজে দাঁড়িয়ে কাঁদবে না তো কাঁদবে কোথায়! তবুও হড়বড় করে নামাজ শেষ করলাম। সে কম্পিত কণ্ঠে আধোআধো স্বরে মুনাজাতে খোদার দুয়ারে পৃথিবীর সুস্থতা চাইতে থাকলো। আমিও "আমীন আমীন" বলে সেই প্রার্থনার শব্দে সমর্থন যোগাতে থাকলাম।

পরদিন সন্ধায় একটু বাইরে বেরিয়েছিলাম। হঠাৎ মাইকে ভেসে আসা সংবাদে আমার হোঁশ উড়ে গেলো। মুয়াজ্জিনের কণ্ঠে শুনতে পেলাম একটি শোক সংবাদ-"আমাদের মসজিদের ইমাম সাহেব আজ সন্ধ্যে বেলা হৃদযন্ত্রের ক্রিয়া বন্ধ হয়ে যাওয়ায় শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেছেন,ইন্নালিল্লাহি ওয়া ইন্না..."! ঘোষণা শুনে আমি পথের বুকে ঠাঁই দাঁড়িয়ে রইলাম পথহারা পথিকের মতো। মানুশটা আপন সন্তানের মতোই আমাকে আগলে রাখতেন, অথচ তিনিই কিনা...! প্রিয় ইমাম সাহেবকে একটু দেখার আশায় আমি ছুটলাম মসজিদপাণে। তাকে শেষ গোসল দিতে মুয়াজ্জিনের সাথে আমিও শরীক হলাম। সারাজীবন যিনি এলাকার মুরদেগানের  গোসল দিয়ে এসেছেন,আজ তাকেই গোসল দেয়া হচ্ছে। বাহ রে নিয়তি!

বা'দাল এশা ইমাম সাহেবের জানাযা হলো এবং তারপর, তাঁর লাশ দাফন করার জন্য বাড়িতে পাঠানো হলো।

বাসায় ফিরতেই এক অনাকাঙ্ক্ষিত দৃশ্য আমার নজরকাড়লো। ঘরে ঢুকেই দেখি আয়নায় বসে সাজছে আফরা। সাধারণতঃ সাজগোজ কিছুটা কমই করে ও। তবু বাসন্তি রঙা শাড়ি,হাই কলারের ফুল হাতা লাল ব্লাউজ,কানে গলায় হালকা গহনা এবং কপালের দুই ভ্রুর ঠিক মাঝখানে ছোট্ট একটা টিপ! বাহ! দেখে চোখ সরানো যায় না-এমন বাহারী রঙে রঙেছে আজ সে। আমি মুগ্ধ নয়নে তাকিয়ে থেকে বললাম,"মুখের পানে চাহিনু অনিমেষে,বাজিলো বুকে সুখের মতো ব্যাথা"।
ও হাসতে হাসতে বললো,"সুখের মতো আবার ব্যাথাও হয় নাকি"?
"হয় তো! সেই ব্যাথাটা বুঝেছিলেন রবী ঠাকুর। আর আজ বুঝেছি আমি"।
"হয়েছে,আর ঢং করতে হবে না। এবার বলো,আমাকে কেমন লাগছে"?
"সত্যি বলছি, তোমাকে আজ দারুণ লাগছে! হালকা সাজে খুব মানিয়েছে। তার আগে বলো এতো রাতে সাজগোজের রহস্য কী"?

রহস্যের কথা জানতে চাওয়াতে নিষ্প্রভ হয়ে গেলো ও। হতোদ্যম কণ্ঠে বিড়বিড় করে বললো,"আজ আমাদের প্রথম বিবাহবার্ষিকী। অথচ পৃথিবীর পথে পথে মৃত্যুর মায়াকান্না আমাদের জীবনের গুরুত্বপূর্ণ দিনটাকেও ভুলিয়ে দিয়েছে। কেমন হবে যদি আমিও না থাকি?তোমাকে তো কিছুই দিতে পারলাম না, কী নিয়ে থাকবে তুমি? কাকে বলবে,মায়াবী! মাথাটা ব্যাথা করছে, একটু টিপে দাও"!
আমি শুধু ফ্যালফ্যাল করে চেয়ে রইলাম-কী বলছে মেয়েটা এসব! ও আবারো বললো,"কবি বলেছেন,

"যে হয়েছিলো ভোর,অথৈ আদর,নামহীন নদী;
একা লাগে যদি,মনে রেখো তাকে"! 

বলেই কেঁদে ফেললো। আমি জানতাম সাদাত হোসাইনের এই পংক্তিটা ওর ফেভারিট। তবে এই নিশুতি রাতে এমন দুটো লাইন দিয়ে ও আমাকে পরাহত করবে-যা আমার কল্পনারও অতিত ছিলো।

আমি বললাম,"আর যদি এর উল্টোটা হয়"? ও কান্না বন্ধ করে আমার দিকে নির্বাক তাকিয়ে  আছে।"অর্থাৎ যদি এই মরনঘাতি করোনা, করুণা করে আমাকেও তার সাথে নিয়ে যায়,তাহলে তুমি কী করবে"?
অপ্রস্তুত-এলোমেলো সে একথা শুনে আরো জোরেশোরে কেঁদে উঠলো। আমি ওকে বুকে টেনে নিলাম। ও আমার বুকের সাথে নরোম কবুতরের মতোই লেপ্টে রইলো। নিস্তব্ধ-নিরবতায় কেটে যেতে থাকলো সময়।

সেই রাতেই হঠাৎ ব্যাথা উঠলো আফরার।

৪]

হাসপাতালের করিডোরে মহা উদ্বিগ্নতায় পায়চারী করছি আমি। অথচ শান্ত-শীতল কণ্ঠে আমার বোন আমাকে বুঝিয়ে যাচ্ছে-"এ্যাই! তুই চুপ করে এদিকটায় বোস! আল্লাহ চাহে তো ভালোয় ভালোয় সবকিছু হয়ে যাবে। তুই শান্ত হয়ে বোস তো"!
পাশের বেঞ্চিতে মহা বিরক্তি নিয়ে বসে আছেন আমার মা। তার বিরক্তির কারণ হলো-এতো দেরী হচ্ছে কেনো?কাজটাতো এতো দীর্ঘ সময়ের না।

ভেতর থেকে হঠাৎ নবজাতকের নব্য চিৎকার বাতাসে ভেসে আসছে। আমি কিংকর্তব্যবিমূঢ় হয়ে তাকিয়ে আছি আমার বড় বোনের দিকে। সে মিটিমিটি হাসছে। একজন নার্স এসে হাসিমুখে বললো,"আরহাম সাহেব! আল্লাহর দরবারে শোকরিয়া করুন। আপনি কন্যা সন্তানের বাবা হয়েছেন"!
"কন্যা সন্তানের বাবা"! আমার সারাজীবনকার সাধ জমে ছিলো যেই বাক্যটা শোনার জন্য,সেই বাক্যটাই আজ আমাকে শোনানো হচ্ছে,অথচ তার প্রতি আমার যথাযথ ভূমিকা ঠিক কী হওয়া উচিৎ, আমি বুঝতে পারছি না।

৫]

সরকারী কোয়ারেন্টাইনে আজ আমার সপ্তম দিন। এখানে রাত দিনের তফাৎ বোঝা যায় না। ঘড়ির কাঁটাটা বোধহয় আটকে গেছে।সময়ও যেনো থমকে আছে কোথাও। সারাক্ষণ একটা বদ্ধ ঘরে আবদ্ধ হয়ে আছি আমরা ক'জন। ডাক্তার-নার্স আমাদেরকে কোনোরকমের ধরা-ছোঁয়া ছাড়াই সুস্থ করে তোলার প্রাণপণ চেষ্টা করছেন।

বড্ড জানতে ইচ্ছে করছে,এখানে যদি আফরা থাকতো,সে কি আমায় ছুঁতো? এই করোনায় যদি আমি মারাও যাই,তবুও কি সে আমায় ছোঁবে না? আমার ইহলোক যাত্রা শেষ হতে যাচ্ছে,অথচ তোমার স্পর্শহীন আমায় বিদেয় দেবে,আফরা? বলো!

মেয়েটার জন্য দিনরাতের  দৌঁড়াদৌঁড়িতে আমি এক্কেবারেই কাহিল হয়ে পড়েছিলাম। চারদিনের মাথায় আমার হাড় কাঁপুনি দিয়ে জ্বর এলো। সাথে ঠান্ডা-সর্দিও। ফার্মেসীতে ওষুধ আনতে যাওয়ায় আমার রোগগুলো দেখে ডাক্তার করোনা উপসর্গ বলে চিহ্নিত করলেন। ভয়ে-শঙ্কায় কুঁকড়ে এতোটুকু হয়ে গেলাম আমি। আমার অনুরোধে ডাক্তার স্বয়ং এ্যাম্বুলেন্সে ফোন করলেন।

একটি এ্যাম্বুলেন্স এলো মিনিট বিশেক পর। তখন পৃথিবীতে হয়তো সন্ধ্যে, নতুবা আরেকটু বাকি। এক অনিশ্চয়তার পথে শুরু হলো আমার যাত্রা।

বদ্ধ কোয়ারেন্টাইনে আমার জীবনের দীর্ঘতম বারোটি দিন কেটে গেছে আজ। আমাকে সুস্থ এবং শঙ্কামুক্ত ঘোষণা করলেন হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ। বারো দিন আগে যখন আমাকে এখানে নিয়ে আসা হয়,তখন কতো কতো উৎসুক দৃষ্টি আমাকে অবলোকন করছিলো। তাদের মারফতে এই দুঃসংবাদ হয়তো পৌঁছে দেয়া হয়েছিলো আমার পরিবার অব্ধি। কী প্রতিক্রিয়া হয়েছিলো আমার মা'র? আমার বোনের? কী ভূমিকা ছিলো আফরার?আমার অবুঝ ছোট্ট মেয়েটাও কি কেঁদেছিলো তার বাবার জন্য?

আচ্ছা, এই মৃত্যুঞ্জয়ী মুসাফিরকে দেখে দ্বিতীয়বার তাদের প্রতিক্রিয়া কী হবে? খুব জানতে চাওয়ার তেষ্টা বুকে আমি দাঁড়িয়ে আছি দরোজার এপাশে। কলিংবেলে টিপ দিতেই কালবিলম্ব না করে দরোজা খুললো আফরা। লোনা অশ্রু ছলোছলো চোখে, ক্লান্ত অথচ সপ্রতিভ কণ্ঠে ও বলে উঠলো,"তুমি"?

এই অশ্রু আনন্দ না বেদনার,বোঝা যাচ্ছে না। আমার চোখেও তখন বয়ে যাচ্ছে মিলনাগ্রাহী  পবিত্র জলধারা। আমি মৃদু হেসে কাজী সাইফুল ইসলামের বিখ্যাত দুটো লাইন আবৃত্তি করলাম,

"তবুও হয়নি মরা অনেক কষ্ট সহে,
কোনো এক অচেনার স্বপ্নের গাঢ় নিমন্ত্রণে..."!

-ইসহাক নাজির,
২০.০৪.২০২০ইং, রোয সোমবার।


মন্তব্যসমূহ

এই ব্লগটি থেকে জনপ্রিয় পোস্টগুলি

এমন দরদি মালী কোথায় পাব খুঁজে

মাদকঃ একটি আলোকচিত্র

জলের গান