গল্পঃ আবিরা ও একটু জমিন




এক]

শরতের থমথমে বিষণ্ন আকাশ। মেঘে মেঘে গলাগলি করে যেনো একঘরে হয়ে আছে। একটু পরপর গুরুম গুরুম শব্দে বৃষ্টি ভাঙার জানান দিয়ে যাচ্ছে নীলাকাশ। ঘরে ফেরার তাড়ায় ব্যাকুল ভঙ্গিতে ছোটাছুটি করছে লোকজন। আজ শুধু তাড়া নেই 'আবিরা'র। এই তো ক'দিন আগেও একটা ঠিকানা ছিলো তার। বাস্তুহারা হওয়া সত্ত্বেও মাথা গোঁজার এক অনিশ্চিত অথচ প্রচ্ছন্ন ছায়া ছিলো। নিজেকে পুড়িয়ে যেমন দেবদারু বৃক্ষটা, আরামপ্রত্যাশী মানুষকে নিজ ছায়া বিলিয়ে চলে, ঠিক তেমনি রোদ্রের প্রখরতা,বাদলা দিনের তাণ্ডব আর সহস্র চোখ রাঙানী উপেক্ষা করে আবিরাকে তার মায়া বিতরণ করতো তার স্নেহময়ী মা; আলেয়া খন্দকার।

তিনি বড্ড অবেলায় ছেড়ে গেছেন নয় বছরের আবিরাকে। চার বছরের আবরারকে সপে গেছেন তার হাতে। আজ মায়ের সর্বশেষ সম্বল আবরারকে বুকে আঁকড়ে ধরেই পথে পথে ঘুরছে আবিরা। পায়ে ছেঁড়া চটি,গায়ে একমাত্র জামা আর পেটে ক্ষুধার অন্ন তালাশে হন্যে হয়ে ঘুরছে সে।

ক্ষুধার্ত আবিরা; ক্ষুধার্ত নিষ্পাপ আবরার।

হাটতে হাটতে এক অভিজাত রেস্তোরার সামনে এসে দাঁড়িয়েছে সে। বড় করুণ স্বরে হোটেলবয়কে বললো,"ভাইয়া! আমি আর আমার ছোটভাই সারাদিন কিছু খাইনি। কিছু খেতে দেবেন"? হোটেলবয় ভারী ত্যক্ত গলায় বললো-"টেকা আছে, টেকা"? নিঃস্ব আবিরা বললো-"টাকা তো নাই"। এবার হোটেলবয় চেহারায় বিকৃতি ও কন্ঠে বিরক্তির সবটুকু ঢেলে দিয়ে বললো, "এহ! টেকা নাই,আবার এত্তো বড় রেস্টুরেন্টে খাইতে আইছে। যা ভাগ"!

দারিদ্রতা আর নির্মমতার উৎপীড়নে উৎপীড়িত আবিরা ছোট্ট আবরারকে কাঁধে নিয়েই সামনে হাটা দিলো।

দুই]

ঝুম বৃষ্টি। ভারী বর্ষণে ঘোলাটে চারপাশ। সাথে আছে প্রবাহিত হাঁড় কাঁপানো বাতাস। বাতাসের ঝাপটায় বৃষ্টি এদিক-সেদিক করছে। আবিরা বসে আছে এক ছোট্ট টং দোকানের সাথে। তার সামনেই দোকানের টিনের চাল থেকে সুন্দর এবং বৈচিত্র কলকলে ফোঁটা ফোঁটা পানি পড়ছে। কাঠের বেঞ্চের নিচে দুটো মধুবন পড়ে থাকতে দেখা যাচ্ছে। এই তো! এক্ষুনিই একটি কুকুর লেজ নেড়ে নেড়ে মহানন্দে ছুটে এসেছে  মধুবন খাওয়ার লোভে। ছোট ভাই আবরার একটু পর পর ফুপিয়ে উঠে বলছে,"ভাত দাও! ভাত দাও"!

চরম ক্লান্তি আর ক্ষুধার তাড়নায় এক মূহুর্তও সইছে না আবিরার।ওদিকে আবারও আবরার কেঁপে উঠে বললো,"ভাত দাও! ভাত দাও"! তীব্র লজ্জা আর অপমানবোধ বাঁধলেও কুকুরের খাওয়ায় ঢিল ছুড়লো আবিরা। ভীত কুকুর তাই "ক্যেউ" জাতীয় শব্দ করে বৃষ্টিতে দৌড় দিলো। কুকুরের উচ্ছিষ্ট-লালায়িত মধুবন! শত ঘৃণা আর আত্মমর্যাদাবোধ পেছনে ফেলে মধুবনটাকে বৃষ্টির দিকে বাড়িয়ে ধরলো আবিরা। এতে করে কুকুরের মুখের লালা আর ধুলোয় একাকার মধুবনটা যদি একটু খাবারের যোগ্য হয়! আবরার ক্লান্ত এবং অস্ফুট কন্ঠে আবারো বললো "ভাত দাও! ভাত দাও"!

তিন]

আবিরার বাবা খন্দকার আকরাম সাহেব সমাজের বিশিষ্ট ব্যবসায়ীর খোলসে একজন ধুরন্ধর নারীবাদী। পুরান ঢাকায় তার ঐতিহ্যবাহী বিশাল চালের আড়ৎ। আকরাম সাহেবের সাথে বহুবছর যাবৎ বিশ্বস্তসূত্রে ব্যবসা করে আসছেন সিরাজুদ্দীন সাহেব৷ নারীবাদী হওয়া সত্ত্বেও ব্যবসায়ের এক পর্যায়ে এসে সিরাজুদ্দীন সাহেবের ঘরণীকে ভালো লেগে যায় খন্দকার আকরামের। ভালোলাগা থেকেই যোগাযোগ রক্ষা। আর এই যোগাযোগ রক্ষা থেকেই....!

নারীবাদী সমাজের কারো কারো ত্রাস সৃষ্টিকারী গরম গরম বক্তৃতার নিচে লুকিয়ে থাকে অন্য কোনো পরিচয়। খন্দকার আকরাম সে দলেরই অভিন্ন এক মুখ। পরকিয়ার এই পর্যায়ে এসে পরিবার-পরিজনের প্রতি তার মনন ও মানসিকতা শূন্যের কোঠায় নেমে এসেছে। এখন আর স্ত্রী-সন্তানদের প্রতি তার মনোযোগ আকর্ষিত হয় না।

পরিবারের প্রতি এই অনিহাবোধের রহস্য, অনুসন্ধিৎসু আলেয়ার কাছে শত ধামাচাপা দেবার অপচেষ্টা সত্ত্বেও উদঘাটিত হয়ে যায়৷ শুরু হয় পারিবারিক গোলযোগ আর সংকোচময় দিন গণা। সামান্য কথাকাটিতেই আলেয়ার গায়ে হাত তোলা শুরু করে আকরাম। এভাবে চলতে চলতেই একদা এক রাতে আবিরা ও আবরারসহ আলেয়াকে ঘাড় ধাক্কা দেয় স্বামী আকরাম।

চার]

আলেয়া খুব বড় ঘরের মেয়ে ছিলেন। তার বাবারও ছিলো পুরান ঢাকায় বিশাল চাল আর মাছের ব্যবসা। এই ব্যবসার সুবাদেই খন্দকার আমিনুর রেজার ছেলে খন্দকার আকরাম তাকে ভালোবেসে বিয়ে করেছিলেন। তাহলে কি তা কেবল স্বার্থই ছিলো? 

আসলে মানুষের সাথে মানুষের কোনো কথা থাকেনা। যা থাকে,তা শুধুই স্বার্থ। এই স্বার্থান্বেষেই মানুষ মানুষের আপন হয়, কাছে আসে। স্বার্থ ফুরিয়ে গেলেই-পাখি উড়াল দেয় অন্য পথের খোঁজে।
আজ নিষ্পাপ দুটো ফুলের মতো বাচ্চাদের নিয়ে পথে পথে ঘুরতে ঘুরতে এসব চিন্তায় আলেয়ার দু'চোখে বাধ ভেঙে আসে অশ্রুরা।

অনাহারে-অর্ধাহারে দিনগুজরান করতে থাকে  বাস্তুহারা এই জীবনগুলো। ভিক্ষাবৃত্তিই এখন পরম উপকারী বন্ধু। অন্যের দেয়া রুটির টুকরো নিজের মুখের সামনে নিতেই কী মনে করে সেগুলো আবার বাচ্চারদের মুখেই তুলে দেন তিনি। এভাবেই একদিন গ্যাস্টিক-আলসারের সমস্যাটা তার গুরুতর হয়ে ওঠে। চিকিৎসার অভাবে মসজিদ হতে মসজিদে নামাজের পর কান্নাকাটি করে কিছু পয়সা-পাতির জোগাড় করে আবিরা। কিন্তু তাতে তার মায়ের ব্যয়বহুল চিকিৎসা করানো সম্ভব যে নয়-এটাই হলো তার তাকদীরের লিখন।

তিন দিন পর হঠাৎ রাতের বেলা আলেয়ার চেহারা সাদা ও রক্তশূন্য হয়ে যায়। আবিরার শতো ডাকাডাকি সত্ত্বেও ঘুম ভাঙেনা আলেয়ার। কখনো যে ভাঙবেও না- এই কথা কে বোঝাবে আবিরাকে! 

সেই মুখচ্ছবি এখনো জ্বলজ্বল করে ওঠে আবিরার মনের মণিকোঠায়। চোখ ভিজে আসে আবিরার। মায়ের পথ ধরে যদি আবরারও চলে যায়,সে আর কাকে নিয়ে থাকবে! কাকে আদর করবে! তার জগৎটা যে ধুঁ ধুঁ খাঁখাঁ করতে থাকবে সারাবেলা! আবরারকে ছাড়া সে বাঁচবে কী করে!মায়ের রেখে যাওয়া এই একটাই স্মৃতি আজ তার সম্বল। হঠাৎ আবারো আবরার বলে উঠলো- "ভাত দাও! ভাত দাও"!

পাঁচ]

আগুন-গরম হয়ে আছে আবরারের গা। মাপলে হয়তো দেখা যাবে তিন কি চার! চিকিৎসার জন্য আবিরার কাছে একটা ফুটো পয়সাও নেই। পয়সা রাখার জন্য তো একটা পকেটের প্রয়োজন। দূর্ভাগ্যবশতঃ আবিরার জোড়াতালিময় সে পোশাকে কোনো পকেটই নেই, থাকতেও হয় না।

ক্ষুধার যাতনা আর তীব্র তিয়াসে আবিরার জীবনপ্রদীপও যেনো নিভু নিভু করছে। গলা থেকে কোনো শব্দ বেরোচ্ছে না। পা-ও চলছে না। তাই আবরারকে নিয়ে শহরের বড় এক ঈদগাহের কোনো এক কোণে কালযাপন করছে আবিরা।
বহু কষ্টে আবিরা পার্শ্বস্থ  চা-পানের দোকানে গিয়ে হাত পাতলো। দোকানির মায়া পড়ে যাওয়ায় তিনটে বাটারবন দিয়ে দিলো সে। আবিরা মহানন্দে একটা আবরারকে দিলো,একটা নিজে খেলো, আরেকটা রেখে দিলো পরবর্তীর জন্য।

কিছুক্ষণ পর-এ মা! এ কী! কুকুরটা বাটারবন নিয়ে দৌড়োচ্ছে কেনো? আবিরাও দৌঁড়তে উদ্যত হলে, তীব্র পেটে ব্যথায় মাথা ঘুরে পড়ে গেলো সে।

বলতে কী, দুর্ভিক্ষ আর অভাবীদের জীবনতরী হরহামেশাই এ দৃশ্যপটের ভেতর দিয়ে অতিক্রম করে। ক্ষুধার তাড়নায় কখনো মানুষ কুকুরের মুখ থেকে তার উচ্ছিষ্ট কেড়ে নেয়! কখনো কেড়ে নেয় কুকুর, মানুষের মুখ থেকে। এই কাড়াকাড়ির মধ্য দিয়েই বেঁচে থাকে জীবনগুলো। 

আবিরার জ্ঞান কখন ফিরেছে সঠিক বোঝা গেলো না। জ্ঞান ফেরার পরেও নির্লিপ্ত চোখে চেয়ে ছিলো কিছুক্ষণ। বোধশক্তি ফিরতে খানিকটু দেরী হয়েছে। তখন রাতের আঁধারে ভোরের আলো মেলাবার এইতো কিছুক্ষণ বাকি। আবরারের গায়ে হাত দিতেই চমকে উঠলো আবিরা! তার গা বরফশীতল! আবিরা ভাবে,কোনো রকম চিকিৎসা ছাড়াই ওর জ্বর কি ভালো হয়ে গেলো? 

"এই আবরার এই! আবরার! এই আবরার"!! 

আবরার ওঠে না আর। নিরব-সর্বস্ব দেহে পড়ে আছে বিবশ হয়ে। যেনো দুনিয়ার প্রতি চরম ক্ষোভে আর জাগবে না বলে পণ করেছে সে ! নিঃস্ব এবং  রিক্ত আবিরা শুন্যে তাকিয়ে থাকে নিরবদৃষ্টে। ভোরের ক্ষীণ আলোয়, ভবের অমোঘ নীতিমালার সামনে,পর্যদুস্ত আবিরার চেহারা সত্যিই বড় ক্লান্ত দেখায়।

এরপর কী হয়েছিলো আবিরার,সে খবর রাখতে পারিনি আমরা৷ সকলের তরে করজোর নিবেদন রইলো-কেউ কখনো যদি এই আবরার আর আবিরার দেখা পায়,পরম মায়ায় না হোক, সামান্য দয়ার বশীভূত হয়ে দু'লোকমা ভাত মুখে তুলে দিলেই হয়তো,আর ক'টা দিন বাঁচতে পারবে এরা। হয়তো অকাল ঝড়ে ঝরে যাবে না এই ফুলগুলো। এই আবরার আর আবিরার মতো নির্মম জীবন যেনো কোনো জীবনকে স্পর্শ না করে।

- ইসহাক নাজির, ১৩/১০/২০২০ ইং।

মন্তব্যসমূহ

এই ব্লগটি থেকে জনপ্রিয় পোস্টগুলি

এমন দরদি মালী কোথায় পাব খুঁজে

মাদকঃ একটি আলোকচিত্র

জলের গান