রোজনামচাঃ ভাইয়া একটা কথা বলি?

ভাইয়া, একটা কথা বলি?


আমার হাতে আবদুল্লাহ আবু সায়ীদ স্যারের “নিষ্ফলা মাঠের কৃষক”। খন্ড খন্ড বিরতিতে পড়ছি তবুও বক্তব্যের প্রভাব হৃদয়ে বিস্তার করছে। বাস এবং যে কোনো দীর্ঘ পথযাত্রায় উপকারী হিসেবে বইকেই সর্বদা প্রাধান্য দিয়ে এসেছি। আজও বইয়ে মনোনিবেশ করেছিলাম। হঠাৎ পাশের সিটে একটু আগেই এসে বসা পিচ্চি ছেলেটা ডেকে বললো, ভাইয়া একটা কথা বলি?


আমি অবাক হয়ে ছেলেটার দিকে তাকালাম। গায়ে হাতাকাটা গেঞ্জি আর নিচে হাফপ্যান্ট। ছেলেটা জিজ্ঞেস করলো, ভাইয়া আপনার কি কোনো ছোটভাই আছে? এই একটা বাক্য দিয়েই পিচ্চিটা আমার মনোযোগ আকর্ষণ করে ফেললো৷ ভাবলাম পিচ্চি হয়ে আরেক পিচ্চির কথা জিজ্ঞেস করে কেনো?

- হ্যা আছে। কেনো?

- আপনি কি আপনার ছোটভাইকে খেলনা কিনে দেন না?

- হ্যা দেই।

- তাহলে আমাকেও একটা খেলনা কিনে দেন না!

এতোক্ষণে বুঝলাম ও আমার কোথায় কোপ মারতে চেয়েছিলো। তবু সেই কোপ উপভোগ করেই বললাম, আমার কাছে যে টাকা নেই!

- বেশি না, শুধু পঞ্চাশ টাকা দিলেই হবে।

- সত্যিই আমার কাছে নেই।

- আচ্ছা, তাহলে আমার থেকে এই চারটা মাস্ক কিনেন।

এতোক্ষণে খেয়াল করলাম ওর হাতে মাস্কের বক্স। আমি বললাম, না না আমার মাস্কের দরকার নেই, তুমিই রাখো।

- না না, নেন না ভাইয়া!

- আহা বললাম তো নেই। 

- আচ্ছা তাহলে দুইটা নেন।

- দুইটার দাম কতো?

- দুইটা দশ টাকা। 


আচ্ছা, আমার কাছে তো ভাংতি নেই, তাই দিতে পারছি না।

- আপনার কাছে কতো আছে? আমার কাছে ভাংতি আছে। দেন ভাংগায়া দিই।

- আমার কাছে একশো টাকার নোট। বলার সাথে সাথেই ওর প্যান্টের সামনে মোড়ানো কোছের ভেতর থেকে এতো মোটা একটা বান্ডিল বের করতে করতে বললো,

- আগে কইবেন তো। দেন, আমার কাছে একশো টাকার ভাংতি আছে। আমি পকেট থেকে বিশ টাকার একটা নোট বের করে বললাম, এই বিশ টাকা নিয়ে দুইটা দশ টাকা দাও তো! ও দুটো দশটাকা দিলে তা থেকে চকচকা একটা নোট ওর দিকে এগিয়ে দিয়ে বললাম, নাও, মাস্ক লাগবে না। তুমি এই দশটা টাকা রাখো। 


ওর পকেটে আমার চেয়েও ঢের টাকা ছিলো। অথচ আমাকে কী অনুনয় করেই না বলেছিলো, ভাইয়া আমাকে একটা খেলনা কিনে দেন। অথচ ও ভালো করেই জানতো, এই চলন্ত গাড়িতে খেলনা কিনে দেয়া সম্ভব না। তারমানে, আমার ছোটভাইয়ের কথা স্মরণ করিয়ে দিয়ে খেলনার আবদার করাটা ছিলো আমার মতো বোকাসোকার প্রতি ওর ফেলা টোপমাত্র। যেই টোপে আমি সহজেই আটকে গেছি। তবুও ওর এই সামান্য চাঞ্চল্যকর আচরণে ওর প্রতি আমার মনোযোগ আকর্ষিত হয়েছিলো। কারণ, ওর বয়সে আমি এতোশতো বুঝতাম না। মানুষ ঠকিয়ে টাকা নেবো তো দূরের কথা, আব্বুকে সত্যি কথা বলে টাকা নিতে এখনো আমার কয়েকবার ঢোক গিলতে হয়।


দ্বিতীয় কারণটা হলো, মুখের মিষ্টি কথায় মানুষের  মনভোলানো। এই মিষ্টি মিষ্টি কথায় পৃথিবীর ইতিহাসে কতো কিছুই যে হয়ে গেলো,তার ইয়ত্তা রাখে কে! মিষ্টি কথার ফাঁদে পড়ে কতো টাকা হাত থেকে বেহাত হয়ে গেলো। মিষ্টি কথার ফাঁদে পড়ে কতো ঘর বেদখল হয়ে গেলো।কতো সাজানো সংসার ভেঙে চুরমার হয়ে গেলো।  মিষ্টি কথার ফাঁদে পড়ে কতো নারীর সম্ভ্রম লুণ্ঠিত হলো। মুখের এই মিষ্টি কথায় মজে যাবার পরিণাম যে কতোটা ভয়াবহ, এখনো তা হাড়ে হাড়ে টের পাচ্ছে আমার পরিবার। সে যদিও ভিন্ন প্রসঙ্গ। 


ছেলেটা আমার টাকা পেয়ে আমার সঙ্গ ছেড়ে পেছনে নতুন কোনো সঙ্গ খুঁজেছিলো, হয়তো কিছু না কিছু পেয়েছিলও। হয়তো ছেলেটা ভবিষ্যতেও এমনি করে সম্মোহন করার চেষ্টা করবে বাড়ির খোঁজে থাকা মানুষকে, তার পরিবারের কোনো প্রিয় মানুষের নাম ধরে। ঠিক আমাকে যেমন আমার আদরের ছোট ভায়ের কথা মনে করিয়ে দিয়েছিলো৷ তবুও ছেলেটাকে ধন্যবাদ, ও ওর মিষ্টিমন্দ কথার ফাঁদে ফেলে একজন দুশ্চিন্তাগ্রস্থ পথিককে সামান্য সময়ের জন্য হলেও  দুশ্চিতার আড়াল করতে পেরেছিলো।


রোজনামচা, ১১.১০.২০২০, রোজ রবিবার।

মন্তব্যসমূহ

এই ব্লগটি থেকে জনপ্রিয় পোস্টগুলি

এমন দরদি মালী কোথায় পাব খুঁজে

মাদকঃ একটি আলোকচিত্র

জলের গান