রোজনামচাঃ একটি বিকেল , একটি সন্ধ্যা

১] একটি দেখা,


স্কুল জীবন পার করে এসেছিলাম সেই দু হাজার  ০৬'এ। তখন ছিলো জীবনের উদয়নকাল। আজ দেখতে দেখতে পার হয়ে গেছে দীর্ঘ চৌদ্দ বছরের একটা জীবন। সাপ যেমন পুরোনো খোলস ফেলে নতুন শরীর ধারণ করে, স্কুল জীবনের দিনকাল ভুলে নতুন জীবনের তাকীদে তেমনি শুরু করেছিলাম সবকিছু। সেই সাথে আলাদা হয়েছিলো আমার পাঠ্যক্রম, আলাদা হয়েছিলো পাঠ্যবই, তেমনি বেশভূষা এবং জীবনযাত্রার সাথে সাথে আলাদা হয়েছিলো আমার সঙ্গী-সাথীরাও। 


না পড়তে পড়তে বুক শেলফের পরিচর্যাহীন বইগুলো ধূলো-বালির আস্তরণে যেভাবে আঁধারে ছেয়ে যায়, সেভাবেই যোগাযোগের অভাবে পাশাপাশি এলাকায় থাকা সত্ত্বেও অদেখাই রয়ে গিয়েছিলো আমার সোনালি  শৈশবের সেই ‘ছোট্ট’ বন্ধুরা।


কোথায় যেনো শুনেছিলাম, দুনিয়াটা গোল, তাই ঘুরে ফিরে একবার দেখা হওয়া কারো সাথে আবারো দেখা হয়ে যায়।নিয়তির ঘূর্ণিপাকে আমাদেরও দেখা হয়ে গেলো আজ। সেই আমি ছিলাম, সেই সাজ্জাদ ছিলো, সেই আলিফ, সেই আকাশ এবং সেই মাজহার ছিলো। যেখান থেকে আমরা হারিয়ে গিয়েছিলাম, সেই স্কুলেরই ত্রি-সীমানা ছিলো। শুধু সেই স্কুল ঘর ছিলো না। (কেননা, তা স্থানান্তর হয়ে গেছে আরেক জায়গায়) শুধু সেই শৈশবের সোনালী দিনগুলো হারিয়ে গিয়েছিলো। সেই সকাল সেই বিকেলের কিচ্ছু ছিলো না। শুধু মাঝখান থেকে হারিয়ে গেলো এক নয় দুই নয় চৌদ্দটা বছরের দীর্ঘ একটা জীবন।


আজ এতোটা বছর পরেও বন্ধুদের আড্ডায়  শৈশবের স্মৃতিচারণার মূহুর্তগুলোতে আমি যেনো শৈশবের স্মৃতির সাগরে ডুবে যাচ্ছিলাম। সেই টিফিনের মূহুর্ত, সেই দৌঁড়া-দৌঁড়ি। টিফিন ফাঁকি দিয়ে ‘ভূতের বাড়ি’ যাওয়া। আমি যেনো সবকিছুতেই আমার “আমিকে” দেখতে পাচ্ছিলাম। রবী ঠাকুর বলেছিলেন সেই কবে, “পুরোনো সেই দিনের কথা ভুলবি কি রে হায়, ও সে চোখের দেখা প্রাণের কথা সে কি ভোলা যায়”! আমরাও কেউই কাউকে ভুলে যাইনি। যদিও বিস্মৃতির অতল গহবরে হারিয়ে গিয়েছিলাম। তবুও আজকের দিনটি মন্দ ছিলো না। 


মানুষ তার জীবনে বারেবারেই শৈশবের কাছে ফিরে যেতে চায়, কিন্তু মানুষ যেখান থেকে ফিরে এসেছে সেখানে ফেরার মতো বাকি কিছুই থাকে না। শৈশবের দিনে আমাদের জন্য এই এক টুকরো স্মৃতি ছাড়া খাজানা কিছুই রাখা নেই। তবুও এই একটু স্মৃতির কাছেই ফিরে যেতে, পবিত্র সেই দিনগুলোর একটু নাগাল পেতে তবুও আমাদের কতো আকুলি বিকুলি, কতো স্মৃতি বিদুরতা, কতো কাতরতা। কিচ্ছুই থাকবে না, কিচ্ছুই থাকে না। থাকে শুধু এই টুকরো টুকরো ভালোবাসা, টুকরো টুকরো প্রেম।


২] একটি বিদায়,


বাইতুস সালামের জীবনে বড় ভাইদের মধ্যে অন্যতম ছিলেন প্রিয় জাদীদ ভাই। অন্য সবার সাথে যেমনই হোক, আমার সাথে ছিলো তাঁর আত্মার সম্পর্ক। অন্তত আমি তেমনটাই অনুভব করে এসেছি। 


বাইতুস সালাম ছেড়ে বিদায় নিয়েছিলাম আরো দু' বছর আগেই। তবু এখানে আসার একটা ভিন্ন উপলক্ষ্য ছিলেন প্রিয় জাদীদ ভাই। এখনো আসা হবে প্রিয় বাইতুস সালামে। কিন্তু এই আসাগুলো তেমন প্রাণবন্ত হবে না হয়তো।কেননা, সময়ের ফাঁকে কিম্বা অসময়ে আমরা আড্ডা দিতাম।


আমাদের আড্ডায় সবসময়ই থাকতো বিচিত্র কিছু। যদিও আড্ডার মূলে ছিলো সাহিত্য-সাধনা। তবু সেই সাহিত্যের আড়াল থেকে আলোচনার টেবিলে পরিবেশিত হতো দেশ, পারিপার্শ্বিক চিন্তাভাবনা, রাজনীতি, শিক্ষাসংস্কার এবং সম-সাময়িক বিষয়াবলি।


বলা চলে, সেই আড্ডার একরকম অবসান ঘটছে আজ। কতো কথা মনে পড়ছে, কতো শতো ব্যথা হৃদয়ে উঁকি দিচ্ছে। সবচে’ বেশি মনে পড়ছে সেই রাতগুলোর কথা, সময়ের প্রয়োজনে যেগুলো হয়ে ওঠেছিলো দেয়ালিকাময়। স্মৃতির মিনারে জ্বলছে আমাদের সেই রাত কয়েকের অক্লান্ত পরিশ্রম।  রাতগুলো জানে, রাতের মূহুর্তগুলো জানে, বাক্যগুলো কতো ছন্নছাড়া ছিলো। দেয়ালিকায় নির্বাচিত হয়ে আসা লেখাগুলো সম্পাদিত ছিলো না। হাতে সময়ও বেশি নেই৷ মনে পড়ছে প্রতিটা বাক্য সর্বোচ্চ সংশোধন এবং সম্পাদন শেষে দেয়ালিকায় তুলছি। আমরা ভাবছি লেখাটার শিরোনাম কী হতে পারে, উপযুক্ত শব্দের প্রয়োজনে কোন শব্দ বসতে পারে, উল্লেখিত বাক্যের পরিবর্তে কোন বাক্যের প্রশ্রয় লেখাটাকে আরো আবেদনময়ী করে তোলে! নির্জন রাতে পুরো মাদ্রাসায় জেগে আছি কেবলই  নির্ঘুম দু’জন, জেগে আছি সাহিত্যের সাধনায় নিজেদের ঘুম বিসর্জন দিয়ে। এই স্মৃতিগুলোই আমাদের ‘বড়’ সম্বল। অন্তত আমার মতো আবেগপ্রবণ এবং স্মৃতিকাতুরে মানুষকে জীবনের স্রোতে ভাসিয়ে নেয়ার জন্য এই কয়েক রাতই যথেষ্ট।


আজ হঠাৎ জাদীদ ভাই বললেন, “রাতে কোনো ব্যস্ততা না থাকলে এশা এখানে পইড়েন। বিদায়ী মুহুর্তের দৃশ্য সম্ভব হলে ক্যামেরাবন্দী করলেন। আপনার সাথে আমার কোনো ছবিও নেই”! একজন মানুষ কতোটা নির্মোহ হলে কোনো জুনিয়রকে এভাবে বলতে পারেন! শুনে হৃদয়ে আর্দ্রতা বোধ করলাম। সময় এবং স্মৃতিকে ধরে রাখার এমন জোড়ালো আহবান কখনও কোনো সুহৃদ বন্ধুও করেছে কিনা, আমার মনে নেই।


সারাদিনই ভাবছিলাম জাদীদ ভায়ের বিদায়ী সভায় একটা হাদিয়া অবশ্যই দিবো। শতো ভাবনার পর  একটা বই দিলাম- আকাবির মনীষীদের দুনিয়াবিমুখ জীবন। ভেতরে শুভেচ্ছা বার্তায় লিখলাম-

“প্রিয় জাদীদ ভাই! 

অনেক পোস্টারে লেখা দেখেছি, অমুক ভাইকে মন্ত্রী হিসেবে দেখতে চাই, তমুক ভাইকে এমপি হিসেবে দেখতে চাই! কিন্তু, আমি আপনাকে ভবিষ্যৎ প্রজন্মের আকাবিরদের মুখপাত্র হিসেবে দেখতে চাই!” 


সন্তান গর্ভে ধারণের কষ্ট কেবল মায়েরাই জানেন। সেই কষ্ট এবং সেই ব্যথা বোঝার সাধ্য এ জগতের কোনো পুরুষের নেই। আর এজন্যই এটাকে বলে মাতৃত্বের ‘বন্ধন’। কিন্তু তার বাহিরেও আরেকটা কষ্ট আছে, আরেকটা বন্ধন আছে। এবং সেই বন্ধনেও আছে অসহনীয় ব্যথা। তা হলো মায়ার বন্ধন, আর বিচ্ছেদের বেদনা। 


সন্তানের কোনো ধরণের কষ্টে মাতৃত্বের সেই বন্ধনে যেমন ব্যথা লাগে, মায়ার এই বন্ধন ছেড়ে যাবার সময়ও ঠিক সেই বন্ধনে টান লাগে এবং ব্যথা অনুভূত হয়। এমনি একটি মায়ার বন্ধন এবং প্রগাঢ়  হৃদ্যতা গড়ে ওঠেছিলো প্রিয় জাদীদ ভাইয়ের সাথে। আর সেই বন্ধন ছেড়ে যেতে আত্মায় টান লাগছে আমার।


হাসি-কান্না সংক্রমিত, এটা জানতাম। কিন্তু একজন বাঙালী হবার সুবাদে জানতে পারছি, এখনকার সময়ে হিংসা এবং হিংসাত্মক চিন্তাধারা আরো বেশিই সংক্রমিত। এই অসময়ে রবের জন্য কোন ভালোবাসা এবং ভালোলাগা সংক্রমিত হলে দোষের কী! মানুষ তো বিদ্বেষই ছড়িয়েছে কেবল, আমি শুধুই ভালোবাসার ফেরি করতে চাই! সেই ভালোবাসা থেকেই বলছি প্রিয় জাদীদ ভাই! আপনাকে মুহাব্বত করি শুধু আল্লাহরই জন্য। এই ভালোবাসাকে পুঁজি করে সেদিন সেই আরশের নিচে দাঁড়াতে চাই, যেখানে এই ভালোবাসার জন্য দাঁড়াতে দেয়ার ওয়াদা করা হয়েছে।




রোজনামচাঃ ৩০.০৯.২০২০ ইং, রোজ বুধবার।

মন্তব্যসমূহ

এই ব্লগটি থেকে জনপ্রিয় পোস্টগুলি

এমন দরদি মালী কোথায় পাব খুঁজে

মাদকঃ একটি আলোকচিত্র

জলের গান