ভাষা সাহিত্য-সাংবাদিকতাঃ প্রাপ্তি ও প্রত্যাশা
সাহিত্যের প্রতি আমার যে ভালোবাসা, তা আজন্ম এবং সহজাত বলেই আমার বিশ্বাস। আমার ধারণা, আমার সাহিত্য-প্রতিভা সেই মানের না হলেও সাহিত্যের প্রতি ভালোবাসা এবং হাহাকারটুকু সঙ্গে করেই নিয়ে এসেছিলাম। সেই ছোটবেলা থেকেই চারপাশে এতো আনন্দ, এতো আদর-আহ্লাদের আয়োজন এবং এতো এতো মানুষের সমাবেশে থেকেও নিজের মধ্যেই কেমন যেন একাকিত্ব বোধ করতাম।
অবসরে নিজেরই অজান্তে আমার ভেতর থিতু হয়ে থাকা আমি'র সাথে কথা বলতাম। কখনো রেডিওতে আবেগঘন আবৃত্তি শোনলে মনটা খুশিতে বাকবাকুম করে ওঠতো। ভাবতাম, এতো সুন্দর করে মানুষ কীভাবে লিখতে পারে! এতো সুন্দর কী করে বলতে পারে! সেসব কল্পনা শুধুই আমার ভাবনার সাগরে ঢেউয়ের ঝাপটার মতো দোলা দিতো।
হিফজখানার পাঠ চুকিয়ে কিতাব বিভাগে উত্তীর্ণ হতেই আমি ধাক্কার মতো খেলাম। সেই ধাক্কার নাম আমার প্রিয় শিক্ষক মুহতারাম আবুবকর মুহাম্মদ আদনান ( আল্লাহ তাঁর হায়াতে বারাকাহ দান করুন-আমীন)। বোধকরি, আমার জীবনের প্রথম বিস্ময়মানব তিনিই। মাদরাসায় তাঁর নেগরানিতে কেটেছে দু' দুটো বছর। তিনি আমাদের উর্দূ পড়াতেন। উর্দূ শব্দগুলোর বিভিন্ন অর্থ তুলতেন এবং বাক্যের ছন্দায়নে আমাদের মুগ্ধ করতেন। তাঁর কথার মাধুর্য এবং ব্যক্তিত্বের মহিমায় আমি উদ্বেলিত হতাম। তাঁর জ্ঞান ও পাণ্ডিত্যের দ্যুতি আমাকে বরেণ্য হবার স্বপ্ন দেখাতো। সেই স্বপ্নের পালে হাওয়ার ঝাপটা দিতো তাঁর কথা বলার অপূর্ব ভঙ্গিমা। এভাবেই তিনি আমার মস্তিষ্কের শাসন করতেন।
তখন পর্যন্ত আমার ধারণা ছিলো, সাহিত্য হলো দীর্ঘ মেয়াদী প্রাতিষ্ঠানিক পড়াশোনার বিষয়। একবার তাঁকেই জিজ্ঞেস করেই বসলাম তিনি সাহিত্যের জন্য পড়ালেখা করেছেন কিনা। তিনি জবাব দিয়েছিলেন, “সাহিত্য হলো সাধনার বিষয়। তুমি এখন থেকেই সাধনা শুরু করলে ভালো একজন সাহিত্যিক হতে পারবে!” শব্দগুলো হুবহু এমন না হলেও কথাটা এমনই ছিলো।
তারপর থেকেই শুরু হলো আমার সাহিত্য-সাধনা। আমার ধ্যান-ধারণার কেন্দ্রবিন্দুতে শুধু একটাই নেশা চড়ে গেলো। আমাকে সাহিত্যের সর্বোচ্চ শিখরে আরোহণ করতে হবে। অনেক পড়তে হবে, লিখতে হবে। তবুও কেমন একটা প্রশ্ন, একটা জিজ্ঞাসা ভেতরে খচখচ করতো প্রতিনিয়ত। হাতে কলমে শিখতে চাওয়ার একটা ব্যতিক্রমী শ্রোত ভেতরে বয়ে চলার গুঞ্জরন শুনতে পেতাম। হঠাৎ কুড়িয়ে পাওয়া স্বর্ণের টুকরো যেমন পালটে দেয় অদৃষ্টের লিখন, একটা লিফলেট তেমনই পরিবর্তিত ভূমিকা রেখেছিলো আমার জীবনে। আওয়ার ইসলাম টোয়েন্টিফোর ডটকমের উদ্যোগে ও ইসলামী লেখক ফোরামের তত্ত্বাবধানে আয়োজিত সাহিত্য- সাংবাদিকতা সার্টিফিকেট কোর্সের সেই লিফলেট আমার জীবনে একটা নতুন দিগন্ত উন্মোচন করেছিলো।
বিভিন্ন কল্পনা-জল্পনার পরে ভর্তি হলাম। শুরু হলো অল্প অল্প করে পূর্ণ হওয়ার গল্প। একেকটি ক্লাস একেকটি পরশপাথর হয়ে ধরা দিলো। একেকজন শিক্ষার্থী ও প্রশিক্ষক মহোদয়গণের স্বতঃস্ফূর্ত উপস্থিতি ও অংশগ্রহণের মধ্য দিয়ে কায়েম হলো ইতিহাসের সূচনা। যে সূচনা জীবনে সফলতার দ্বার খুলে দেয়। সাহিত্য-সাংবাদিকতার এই কোর্স দেশের বিভিন্ন মাদারিসের স্বপ্নবাজ কিছু তরুণ তালাবাকে দেশের প্রখ্যাত ও প্রথিতযশা সাহিত্য-সারথির সাথে একাকার করে দেয়ার সেতুবন্ধনের কাজটিই করেছিলো। আমাদের জিজ্ঞাসু ও স্বপ্নদীপ্ত চোখের সামনে এনে দাঁড় করিয়ে দিয়েছিলো আমাদের কাঙ্ক্ষিত মানুষদেরকে। যাদেরকে আমরা শুধু পড়ে এসেছি, যাদের নামটাই আমাদের কানে বিকট শোনাতো, তাঁদেরকে পালটা প্রশ্ন করার সুযোগ সত্যিই বেশ উপভোগ্য ও আনন্দের ছিলো।
খালি কলস কিংবা হাড়ি পানিতে চেপে ধরার পর ভেতরকার হাঁসফাঁস করতে থাকা বাষ্পের মতো আমার বুকেও সাহিত্য তেমনি হাহাকার করে। সেই বদ্ধ হাহাকার কিছুটা হলেও প্রশমিত করার জন্য আওয়ার ইসলাম ও বাংলাদেশ ইসলামী লেখক ফোরামকে আমার সালাম। এমন আয়োজন আরো হোক। ছুটে আসুক স্বপ্নালু তরুণেরা। স্বপ্ন দেখার এই তো শুরু, এই তো সূচনা।
- ইসহাক নাজির
রাত ০২:১২ মি. ০৭-০১-২০২১ ইং, বৃহস্পতিবার
(প্রবন্ধটি আওয়ার ইসলাম টোয়েন্টিফোর ডটকমের তত্ত্বাবধানে ইসলামী লেখক ফোরাম কর্তৃক আয়োজিত ভাষা সাহিত্য সাংবাদিকতা কোর্সের শেষে পরিক্ষার উদ্দেশ্যে লেখা)
মন্তব্যসমূহ
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন