রোজনামচা- চাওয়া-পাওয়ার কাছে জীবন যখন মূল্যহীন
এক বন্ধু গ্রাম থেকে এসেছে। নতুন মাদ্রাসা দিয়েছে। মাদ্রাসার কিছু কালেকশনের জন্যই আসা। কথাবার্তার এক পর্যায়ে গ্রামে ওর মাদ্রাসার পার্শ্ববর্তী আরেক মাদ্রাসার কিছুদিন আগে ঘটে যাওয়া একটা ঘটনা শোনালো। আমি তো শুনেই অবাক। এ কী করে সম্ভব? চাওয়া-পাওয়ার কাছে জীবনের কি কোনোই মূল্য নেই?
ঘটনাটা পাশের মাদ্রাসার নাজেরা বিভাগের ১১/১২ বছরের একটা ছেলের। ছেলেটা কলরবের ভিডিওগুলো দেখতো সবসময়। তাঁদের মুভমেন্ট, চলা-ফেরা, পোশাকাদি সবকিছুই ওকে আকর্ষণ করেছে। বাবা দিনমজুরও না বললে চলে। ৫০০ টাকা কামাই করতে দুই তিনদিন লেগে যায়। ছেলে বায়না ধরলো, একটা জুব্বা বানিয়ে দিতে হবে। কলরবের মতো। খুব কষ্টে ইনকামের টাকা জমিয়ে বাবা ওকে একটা জুব্বা বানিয়ে দিলো।
শুধু জুব্বায় নিজেকে মানাচ্ছে না দেখে আবারো একটা কেডস কেনার বায়না ধরলো। বাবা এখন কেডস কেনার টাকা পাবে কোথায়! যেনো ছেলেকে বুঝ দেয়া যায় এমনভাবে বাবা বললো এক দুইশোর মধ্যে কোনো কেডস কিনে দেবেন৷ ছেলের তাতে মন ভরে না। তার কথা, কমপক্ষে পাঁচশো টাকার কেডস তো কিনে দিতেই হবে। তার অনবরত বায়না আর জেদ দেখে একপর্যায়ে রাগ হয়ে বাবা বললেন, কিনে দেবেনই না।
যেই কথা সেই কাজ। এখানে একদিন গ্রামের পার্শ্ববর্তী কোনো বাড়িতে বিয়ের অনুষ্ঠান। বাবা কাজে বের হলে, মা বিয়ের অনুষ্ঠানে গেলেন। ঘরে সেই ছেলেটা। ওর চাচাতো ভাইবোনেরা এসে ওকে বিয়েতে নিয়ে যাওয়ার জন্য খুব জোরাজুরি করতে লাগলো। বাপের বেটা যাবে না তো যাবেই না। আর চাচাতো ভাইবোনেরাও তাকে না নিয়ে যাচ্ছে না। শেষপর্যায়ে ভাইবোনকে ধাক্কা দিয়ে বের করে দিয়ে ভেতর থেকে খিল মেরে দিলো।
আহ! ঘটনা এখানেই ইতি ঘটলে কী এমন ক্ষতি হতো! বিয়ে বাড়ি থেকে ফিরে মা খুব চেষ্টা করেও দরজা খুলতে পারলো না। শেষমেশ দরজা ভেঙে ঢুকতে হলো। ঢুকে যা দেখা গেলো, তা দেখার এবং শোনার জন্য আমরা কেউই প্রস্তুত নই। জি, যা ধারণা করেছেন, তাইই ঘটেছে। ১১/১২ বছরের এইটুকু একটা বাচ্চা কেডস না পাওয়ার দুঃখে-অভিমানে ফ্যানের সাথে ঝুলে পড়লো!
জীবন! জীবন!! যে জীবন খেলনার!
এ জীবনের কী মর্ম হলো? সমাধানই বা কী হলো? পাঁচশো টাকার একজোড়া জুতোর কাছে যে জীবন নস্যি!
একজোড়া জুতোর ভালোবাসায় ছেলেটা নিজের জীবন সঁপে দিতে পারলো?
মানুষ বড়ই বৈচিত্র্যময়। মানুষকে কী দিয়ে যে সঙ্গায়িত করা যায়, আমার জানা নেই। কারোরই জানা থাকার কথা না। কেউ কোটি কোটি টাকার বিনিময়ে হলেও বাঁচতে চায়। তার কাছে জীবনের মূল্য কোটি টাকারও বেশি। কেউ মাত্র পাঁচশো টাকার বিনিময়ে জীবনটা ফ্যানের সাথেও লটকে দিতে পরোয়া করে না। তার কাছে জীবনের মূল্য পাঁচশো টাকাও না। মানুষ কেমন বৈচিত্র প্রাণী ভেবে দেখেছেন?
রোজনামচা-
চাওয়া-পাওয়ার কাছে জীবন যখন মূল্যহীন/ ইসহাক নাজির
রাত ১০:৪৫ মিনিট। ১৩-০১-২০২১ ইং, বুধবার।
মন্তব্যসমূহ
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন