মৃত্যুমুখী জন্মদিন
আমরা এমন একটা পরিবেশ ও পরিস্থিতির মধ্যে বড় হয়েছি, যেখানে সম্পর্কের তেমন একটা গুরুত্ব না থাকলেও সম্পর্কসূত্রে গড়ে ওঠা দিনগুলির খুব গুরুত্ব আছে। জন্মবার্ষিকী, মৃত্যুবার্ষিকী ও বিবাহবার্ষিকী আমাদের সমাজে নানান কারণে খুবই গুরুত্ববহ। আমার পরিবারে এসবের পুরোটা না থাকলেও এর একটা ক্ষীণ ও প্রচ্ছন্ন প্রভাব সবসময়ই ছিলো।
ধর্মীয় চেতনা ও আদর্শগত দৃষ্টিকোণ থেকে বলতে লজ্জার এবং সংকোচ মনে হলেও এটাই সত্য যে, আমার ভেতরেও এই নামমাত্র আনুষ্ঠানিকতা সেই ছোট্ট বয়স থেকেই খুব সামান্য পরিসরে যেমন ছিলো, এখনও আছে। এই দৃষ্টিকোণ থেকে বেরিয়ে আসতে আমার আরো অনেক সময়ের প্রয়োজন।
আমাদের আত্মীয় স্বজনের মধ্যে মানুষের জন্ম মৃত্যু নিয়ে একটু বাড়াবাড়ি রকমের উত্তেজনা আমি সবসময়ই লক্ষ্য করে এসেছি। মানুষের জন্ম নিয়ে এতোটা উত্তেজিত না হলেও, আমি মানুষের মৃত্যুর বিষয়ে দিনমান বিস্তর ভাবি। যে জীবনের জন্য আমাদের এতো আয়োজন, যেই যৌবনের জন্য আমাদের ভেতরে বিপুল চর্চা এবং তেজস্বী উন্মাদনা– সেই জীবন-যৌবনের করুণ পরিণতি সম্পর্কে কুল-কিনার করতে না পেরে যেন আকুলপাথারে ডুবে আছি।
আগেই বলেছি, আমার জীবনে এইসব দিনগুলোর গুরুত্ব এখনো বিপুলপরিমাণে রয়ে গেছে। ইংরেজি ক্যালেন্ডার মাফিক আমার জীবনের অতল এক আনন্দের দিন আজ (০৯ই জুলাই)। চব্বিশ পেরিয়ে পঁচিশের হাতছানি। রজতজয়ন্তীর মোহময় অবতারণা। মানুষ বলে– জীবনটা আরেকধাপ এগিয়ে গেলো। আসলেই কি জীবন এগিয়ে যায়, নাকি মৃত্যু কাছে আসে?
জন্ম যেহেতু পেয়েছি, সরল হিসেবে মৃত্যুকেও তাই আসতেই হবে। কিন্তু, আমি তো মৃত্যুকে সহজভাবে মেনে নিতে নারাজ। সুন্দর গোছগাছ পরিপাটি জীবনে মৃত্যু কেন আসবে? মৃত্যু আছে বলে যদি জীবন সুন্দর হয়, তাহলে তার আগমনে জীবনে বার্ধক্যের ছাপ কেন পড়বে? যত্নে গড়া দেহ, আশেপাশের মানুষজনের সাথে কৃত লেনদেন, পাশাপাশি পথচলায় গড়ে ওঠা ভালোবাসা– সব ছেড়ে কেন একলা হাতে যেতে হবে?
জীবনের সুন্দর সজীবতা ধরে রাখতে এই যে আমাদের এতো ব্যস্ততা, উত্তপ্ত যৌবনকে আরো উদ্দীপিত এবং সতেজ প্রমাণ করতে বিচিত্র প্রসাধনীর এই ভকভক গন্ধ, শরীরে কাপড়ে আতর গোলাপ আর বেলির সুবাসিত নির্যাস– কেউ কি বলতে পারে, কখনো এরা জীবনকে ধরে রেখেছে? কেউ কি বলতে পারে, এরা জীবনকে ধরে রাখতে মৃত্যুর পথরোধ করেছে?
মৃত্যুময় জীবনে বেঁচে থাকার অন্যায় আবদারে মানুষের মুখরিত জয়গান এবং স্বার্থসর্বস্ব পদচারণা মানুষকে আরো ধ্বংসের দিকেই নিয়ে গেছে। এতোকিছুর পরেও মৃত্যুময় কণ্টকিত ধ্বংসের পথেই হাঁটতে হলে মানুষের জীবনে আর আছেটা কী? যদি ললাটে মৃত্যুই লেখা থাকবে, যদি মৃত্যুই হবে স্বয়ং সত্য, তবে মানুষের এতো দৌড়ঝাপের কী দরকার? মৃত্যু আসবে জেনে কেন আমরা জীবনকে সাজাই, সাজানো জীবনেও কেন ফিরে মৃত্যু আসে?
বিরল মানবজনমে একটা ঝকঝকে মসৃণ দেহে চামড়া জড়িয়ে আসে, দৃষ্টির আলো নিভে যায়, আর কখনও-বা সর্বগ্রাসী শক্তি ফুরিয়ে আসে, কেন? কেন এমন হয়? এ আমার সবিস্ময় কৌতুহল। অবধারিত মৃত্যু এবং নির্মম নিয়তির কাছে মানুষের এই অসহায়ত্ব আর দারিদ্রতার বন্দনা আমি খুব সহজে মেনে নিতে পারি না।
|| মৃত্যুময় জন্মদিন, ইসহাক নাজির ||
|| ১০ই জুলাই ’২১ ইং, শুক্রবার, রাত ০২:১৩ মি. ||

মন্তব্যসমূহ
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন