নতুনের আয়োজন
এ ঘরের সাথে আমার ‘একযুগ’ কালের দীর্ঘতম পরিচয়। কাঠফাটা প্রখর রোদের দিনে, সর্বনাশা বৃষ্টির প্লাবিত রাতে, ক্লান্তিময় রোগের আতিশয্যে এবং সর্বহারা অসহ্য শোকে এ আমাকে মনভরে থাকতে দিয়েছে। আমার হাসির খলখলে শব্দ যেমন এর মনে থাকার কথা, আমার কান্নাভেজা দিনরাত্রিকেও এর পক্ষে ভুলে যাবার জো নেই। নিজেকে ভেঙেগড়ে পরিচয় দিয়েছি আমি এখানে। এখানে নিজের প্রতিটি অধ্যায় আদ্যোপান্ত বর্ণনা করেছি।
এখানকার দেয়ালের প্রতিটি কোণ জানে আমার পরিচয়। দেয়ালের বুকে কান পাতলে হয়তো শোনা যাবে আমাকে। শোনা যাবে আমার জীবনের গেঁয়ো গীত আর কোরানের শুদ্ধস্বর তিলাওয়াতকে। আমার নিস্তরঙ্গ জীবন এবং খরতর যৌবনের দ্বন্দ্বসমাস সম্পর্কে পরিপূর্ণ ওয়াকিবহাল এই চারদেয়ালে ঘেরা ঘরময় জগতটা। তাই একে ছেড়ে যেতে আমার কোন তাড়া নেই; তবে ভেতরে ভেতরে তাড়না আছে খুব।
ঘরটা দেখতে দেখতে ফাঁকা হয়ে এসেছে। সামানপত্র ইতোমধ্যেই সরিয়ে ফেলা হয়েছে৷ আমার কোন বইপত্রও এখানে আর নেই৷ আমাদের নতুন ফ্ল্যাট বাসায় সেগুলো স্বস্তির নিঃশ্বাস নিচ্ছে। এই ছাঁদের নিচে আমাদের বসবাসের দীর্ঘতম ‘একযুগে’ কখনো এমন হুলুস্থুল পরিবেশ এবং বিরান চিত্র আমি দেখিনি।
মানুষ খুবই আয়েসি প্রাণী। নতুনত্বের খোঁজে সবকিছুকে পেছনে ফেলে সাগর নদী ডিঙিয়ে যেতেও পছন্দ করে। মানুষের শিরা উপশিরা ও চৈতন্যে এই অসীম ‘অসুস্থশক্তি’ (!) চিরহরিৎ সজীবতা নিয়ে সেই আদিকাল থেকেই ঘুরে ফিরছে। দিবালোকে কিম্বা অতল আঁধারে আমার চরিত্রের কোণায় কোণায় এই আদীম সভ্যতার সঙ্গিন উপমা– সত্যি বলতে– আমি খুব কমই খুঁজে পেয়েছি।
পুরোনো মানুষ আর পুরাতন জিনিসপত্রের প্রতি আকর্ষণী বোধ আমার থেকেই যায়। জলজ্যান্ত মানুষের সাথে জড়-জিনিসের প্রতিও একরকমের জুনুনি আমি অনুভব করি। এই জুনুনিকে প্রতিপালন করে মনুষ্যসন্তানের আদরে যত্নে বড় করি৷ তাই এদের ছেড়ে ফেলে আসার কথা কেউ স্মরণ করিয়ে দিলেই মনের বীণাতারে কোথায় যেন টান পড়ে। খুব কাছের কেউ কেউ আমার এই ‘অবহেলিত রুগ্ন আদর্শে’র সাথে খুব পরিচিত এবং হয়তো ত্যক্তবিরক্তও।
দীর্ঘদিনের পায়েহাটাপথ, পরিধেয় জামা-জুতো, পানিয় আসবাব, পকেটে থাকা দশটাকার সুলভমূল্যের টিস্যুর প্যাকেট, ক’ দিনের ব্যবহৃত কলম, আঙুল বুলিয়ে যাওয়া পরশসিক্ত প্রিয় বই, বসবাসের দালানঘর– সবই আমার চিরচেনা হয়ে ওঠে। কাউকে রেখে বিকল্প গ্রহণে তাই আমি অনভ্যস্ত।
একটি বস্তুর সৌন্দর্য সৌষ্ঠব আর ধারাবাহিকতা যখন তার মান মর্যাদাকে অক্ষুণ্ণ ও শিরোধার্য হিসেবে ধরে রাখে, তখন সেখানে বিন্দুমাত্র ব্যাঘাত ঘটলেই তার সর্ব সৌন্দর্য আর যাবতীয় মাধুর্য হারিয়ে ফেলার দামামা বেজে ওঠে। এই ঘর আমাদের হাসিকান্না খোদিত সেই সমূহ জৌলুস আর প্রতিপত্তি হেলায় হারিয়ে ফেলছে দেখে এর প্রতি কষ্ট হয়। এই কষ্টটা যে নিজের প্রতিও জাগে, কাকে বোঝাই?
এখানের এই দীর্ঘ ‘পরবাসে’ ছাঁদে উঠেছিলাম মাত্র এক কি দু’বার। সত্যি বলতে–এর বেশি না। এই ঘরের ছাঁদে ওঠা বারণ। ছাঁদের চাবি বাড়িওয়ালার হাতে এবং সেখানে ওঠার পথটাও সংকীর্ণ। ছাঁদ ধরে যেই সিঁড়ি, তার রেলিংয়ের সাথে বাড়িওয়ালার লাগোয়া কলাপসিবল গেইট বলেই তা ডিঙিয়ে ছাঁদে যাওয়ার তেমন আগ্রহবোধ করিনি কখনো। কখনো আমার আজন্ম ভালোবাসার সেই আকাশ দেখিনি। আকাশের প্রতি মুগ্ধ আলোড়ন ব্যক্ত করার সুযোগটা পেলাম কই?
আমার ঘরের জানলা গলে আকাশের একটা টুকরো দেখা যায় বৈ কি। অথচ সুবিশাল নিঃসীম আকাশ আমার অদেখাই রয়ে যায়। না পাওয়া হয় সূর্যোদয়, না দেখা যায় তার অস্ত যাওয়া। এই বাড়ির পানির অসুবিধাও এক অমোঘ সত্য। ক্ষণস্থায়ী জীবনের একরকম স্থায়ী নিবাস হিসেবে যেখানে আমরা উঠতে যাচ্ছি সেখানে এসবের কোন বালাই নেই। ছাঁদে যাওয়া যায়, মনখুলে আকাশ দেখা যায়, পানিরও নেই কোন ঝুটঝামেলা।
আমাদের পরেও এই ঘর মানবজাতীর কোন এক প্রতিনিধির সাংসারিক প্রাণপ্রদ স্পন্দনে দিবানিশি জাগরুক থাকবে। তাদের দাম্পত্য ইহলীলা দেখে আমাদের ইবাদতের স্বতঃস্ফূর্ত গাম্ভীর্যের স্মরণে আক্ষেপ করবে এ ঘরের অনু-পরমাণুরা। হয়তো কারো নুপুরের মজলিসভাঙা শব্দে রাত্রিকালীন মুনাজাতের নিরব মাধুর্যের প্রতি রোনাযারি করবে। তাদের গায়ের উৎকট গেঁয়ো-গন্ধের তোড়ে আমাদের আতরের স্বভাব সজীবতাকে মনেপ্রাণে কুর্ণিশ করবে৷ হয়তো এমন কিছুই, হয়তো কিছুই না।
গ্রামের মানুষ শহরে এলে যেমন গ্রামের স্নিগ্ধতা কোমলতা এবং অসীম নিরবতাকে ফিরে পেতে চায়, শহরের মানুষজন গ্রামে গেলে শহুরে ব্যস্ততা কোলাহল আর জনঅরণ্যকে যেভাবে হাহাকার বুকে স্মরণ করে, আমার এখনকার অবস্থা ঠিক তেমনই। একপাশে নিজস্ব (ক্ষণ-) স্থায়ী বাসস্থানের প্রতি যুগযুগান্তের তৃষিত অনুরাগ, আরেকপাশে স্মৃতিবিজড়িত পুরাতনকে বিবর্জনের মতো নিদারুণ যন্ত্রণার অবিমিশ্র অনুভূতির মধ্য দিয়ে যাচ্ছি আমি।
ভালো মন্দ, কালো সাদা, নতুন পুরাতন সবে মিলেই যেহেতু জীবন, সবকিছু মেনে নিয়ে তাই হাসিমুখে ভালোবাসার সাম্পানওয়ালা আমি চললাম।
|| নতুনের আয়োজন || ইসহাক নাজির ||
|| ৩০ শে জুন, ২০২১ ইং || রাত ০৮:০০ মিনিট ||

Bah! Valo legeche
উত্তরমুছুন