একটি শুভ্র প্রার্থনা



জায়নামাজে দুয়ায় বসে কাঁদছেন রোকেয়া। কান্নার দমকেই বোঝা যাচ্ছে কতোটা আকুলতা তাঁর মুনাজাতে। যেন অসহায় কোন বাঁদি মনিবের দুয়ারে প্রাণভিক্ষার দাবীতে ফোঁপাচ্ছে। মানুষ তার রবের নিকট কতোটা যে অসহায়, রোকায়া জামানিকে দেখে কিছুটা হলেও আঁচ করা যায়। 


তিনি কাঁদো কাঁদো কণ্ঠে বলছেন, “আয় আল্লাহ! আয় পরওয়ারদেগার! আর কত অপেক্ষা করা যায়! আর কতকাল এতোদূরে বসে থাকতে হবে! সারাজীবনের সাধ এবার তো পূরণ করুন! জীবনের দ্বারপ্রান্তে এসে পৌঁছেছি, সারাজীবনের যত পুঁজি একত্র করে আপনার দুয়ারে আঁচল পেতেছি। এবার তো দেখিয়ে দিন আপনার হারামাইনের আলো! এবার তো যেতে দিন আপনার ঘরের দরজায়! এবার একটু আশ্রয় দিন আপনার কাবার ছায়ায়! আপনার হাবীবের রওজায় গিয়ে সালাম পেশ করার তাওফিক দিন মালিক! আমার সারাজীবনের কষ্ট-সাধনা এবার কবুল করুন”!


মুনাজাত শেষ করলেন রোকেয়া জামানি। খুবই আল্লাহভীরু নারী তিনি। স্বামী মারা যাবার পর একমাত্র ছেলে রাকিবকে নিয়েই কাটিয়ে দিয়েছেন সারাটা জীবন। আত্মীয়স্বজনের পীড়ায় পড়েও ছোট্ট রাকিবের মুখের দিকে তাকিয়ে আর বিয়ে করেননি তিনি। 


একজন বিধবার এ সমাজে মূল্য কতোটুকু? তাই বিভিন্ন জায়গায় চাকরীর আবেদন করা সত্ত্বেও তার কর্মসংস্থান জোগাড় হয়নি দেখে ব্যবসার জোয়াল কাঁধে তুলে নিয়েছেন। ডিম বিক্রি করে সেই টাকায় সংসার চালিয়েছেন। ছেলেটাকে খুব শিক্ষিত করে গড়ে তুলতে না পারলেও মানুষের মতো মানুষ করেছেন। আর আয়ের বর্ধিত অংশ জমিয়ে রেখেছেন জনম জনমের ভালোবাসা বাইতুল্লাহর হজ্বের আশায়।


চোখ মুছে রাকিবকে ডেকে পাঠালেন রোকেয়া জামানি। ভাবছেন, এবার আল্লাহ সহায় হলে হবেই হবে। ডিম বিক্রি করে সারা জীবনের পুঞ্জিভূত সমস্ত অর্থই গতকয়েকদিন আগে পার্শ্ববর্তী ট্রাভেলসে জমা দিয়ে এসেছেন। ট্রাভেলস পরিচালক খুবই ভালো মানুষ। উনি একটা ব্যবস্থা করবেনই। 


রাকিব এসে দাঁড়িয়ে আছে পাশেই, “মা, ডেকেছ”?

“হ্যা বাবা! আগামিকাল ট্রাভেলসে গিয়ে একটু খোঁজ নিয়ে এসো! কী খবর, কী আশয়–বিষয় একটু জেনে এসো, কেমন! তোমার বাবার খুবই ইচ্ছে ছিলো আমরা একসাথে হজ্বে যাব। সেই ইচ্ছে আর পূরণ হলো কই! যাই হোক, এখন অনেক রাত। ঘুমাও গিয়ে। আর কাল গিয়ে একটু খবর নিয়ে এসো"!


“ঠিকাছে মা, তুমিও এখন ঘুমাও তো” বলে বিছানায় মা’কে শুইয়ে দিলো রাকিব!


২]


বেলা বাজে বারোটা। "জিয়ারতে বাইতুল্লাহ ট্রাভেলস" এর সামনে জন-মানুষের ভীড়। রাকীব বুঝতে পারছে না হজ্ব ট্রাভেলসের মতো একটা গুরুত্বপূর্ণ জায়গায় এতো সরগম কিসের। কী হয়েছে বোঝার জন্য তাকে আরেকটু সামনে এগিয়ে যেতে হবে। সে জানে না, তার জন্য সেখানে কী অপেক্ষা করছে। 


ভীড় ঠেলে উত্তেজিত মানুষের নাকের ডগায় গিয়ে দাঁড়ায় রাকিব। আশেপাশে হৃদয়ভাঙা সম্ভাব্য হাজ্বী (!) সাহেবদের জোড়ালো বাক্যব্যয়ে কোনকিছুই আর অস্পষ্ট থাকে না তার কাছে। ট্রাভেলসের গেইটে ঝুলছে বড় লাল তালা। ইট পাথরের আঘাতে কোথাও বেঁকে গেছে, কোথাও ভেঙে গেছে। 


বিক্ষুব্ধ জনতাকে থামানোর সর্বোচ্চ চেষ্টা করছে পুলিশ বাহিনী। বুকের উপর সাদা নেইমপ্লেটে ‘খোরশেদ’ লেখা পুলিশটা বলছে, “দেখুন, আপনারা শান্ত হোন। এভাবে করলে তো আমরা আমাদের ইনভেস্টিগেশন এগোতে পারব না। সে যেখানেই পালিয়ে থাকুক না কেন, যাবে আর কোথায়! আমাদের উপর আস্থা রাখুন। আমরা তাকে খুঁজে বের করবই”।


সবাই জোরগলায় ক্ষোভ ঝাড়লেও কিছুই বলার বা করার থাকে না রাকিবের। ভাঙা হৃদয় নিয়ে বাসার পথ ধরে সে। 


রাকিবের মৌনতা আর ক্রমাগত নিঃশব্দ ক্রন্দন অনেক কিছুই বুঝিয়ে দেয় রোকায়াকে। আমতা আমতা করে রাকিব বলল, “সবকিছুই শেষ হয়ে গেছে মা, সবকিছুই শেষ হয়ে গেছে! আমাদের আর কিছুই রইল না!” হঠাৎ বিকট একটা চিৎকার শুনে মুখ তুলে তাকায় রাকিব৷ মা পড়ে আছে চৌকির পায়ায়। বাইতুল্লাহর আলো দেখার আগেই দু’চোখে অসীম আঁধার নেমে এসেছে রাকিবের মা রোকেয়ার। মা যে আর কখনো চোখ মেলে তাকাবে না, এ কথা জানে না রাকিব!


|| একটি শুভ্র প্রার্থনা, ইসহাক নাজির || 

|| ৩১/০৭/২০২০ ইং, শুক্রবার, বিকেল ০৫:০৮ মিনিট ||

মন্তব্যসমূহ

এই ব্লগটি থেকে জনপ্রিয় পোস্টগুলি

এমন দরদি মালী কোথায় পাব খুঁজে

মাদকঃ একটি আলোকচিত্র

জলের গান