রোজনামচা

প্রেসক্লাবের সাংবাদিকতা ক্লাস শেষে জুমা পড়তে গেলাম বাইতুল মুকাররম। উত্তর গেইটের আঙিনায় আসতেই দেখি বিশাল পুলিশি বহর। তাদের প্রহরায় মেইন গেইট বন্ধ রেখে চেকিং গেইট দিয়ে মুছুল্লিদের ভেতরে ঢুকতে হচ্ছে।
বাইতুল মুকাররমে পড়া এ আমার দ্বিতীয় জুমা। এর আগে গতো সপ্তাহেই প্রথম পড়েছিলাম৷ তাই মিছিল বা গণসমাবেশের সাথে আমার বোঝাপড়াটা খানিকটু কম। একেবারে যে নেই তাও না৷ আসা হয় না আরকি! এই-ই যা! আর এজন্যই এখানকার পুলিশি প্রহরা দেখে ভেবে বসেছিলাম ভিন্ন কিছু। সহপাঠি-সুহৃদ সালমান বললো, মিছিল কিংবা গণসমাবেশে তারা নাকি প্রটেকশন হিসেবে থাকে। কথাটা খুব একটা মনপুত না হলেও ফেলে দিলাম না।
নামাজ পড়ে বের হতেই দেখি গেইট থেকে না'রা দিতে দিতে কেবলই বেরিয়েছে একদল তৌহিদী জনতা। তবে সেখানেই তাদেরকে পুলিশি বাঁধার সম্মুখীন হতে হলো। মুখে শ্লোগান, শরীরে জোশ আর বুকে ঈমানি চেতনা। একেকজনের না'রায় ছিলো একেকরকম উচ্ছ্বাস, যেনো জলোচ্ছ্বাসের মতোন। তবুও, কোনো প্রতিশ্রুত নেতৃত্ব নেই, কোনো উচ্চকিত বয়ান-বক্তব্য নেই- এভাবেই নামাজ শেষে হুট করে বেরিয়ে পড়াটা আমার কাছে কেমন যেন ঠেকলো।
আরও কাজ আছে আমার। একজন আসবেন। তার অপেক্ষায় মসজিদে বসে থাকার চেয়ে মিছিলেই যোগদান আমার কাছে কিছুটা খোরাক, আর কিছুটা উপাদেয় বলে মনে হলো। আমি আর সালমান মিছিলে আস্তে আস্তে মিলিয়ে গেলাম। মিনিট তিনেক পর তৎক্ষণাৎ ছেড়ে দিলো পুলিশেরা। বাঁধভাঙা তরঙ্গের মতো এগিয়ে চললো মিছিল। একেক সময় একেকজনের গর্জে ওঠা। এখন এখানে কেউ না'রা দেয়, পরক্ষণে ওখানে আবার কেউ। বিজয়নগর পেরিয়ে শান্তিনগর। লাশের খাটিয়া যেমন ঘুরে ঘুরে সবার হাতবদল হয়, মুহুর্মুহু শ্লোগানের ধ্বনিরাও তেমনি ঘুরে ঘুরে প্রতিধ্বনিত হয় এর ওর মুখ থেকে।
শান্তিনগর পর্যন্ত পৌঁছে আমরা এক জায়গায় জড়ো হই। নাম না জানা কেউ এপার-ওপার পথের ডিভাইডারে দাঁড়িয়ে বক্তব্য শুরু করলেন। তিন/চার মিনিটের বক্তব্য শেষে মুনাজাতের পর্ব। মুনাজাত ধরেছি কেবল, ডিভাইডারে দাঁড়ানো আরেকজনের চোখের ইশারা অনুসরণ করে পেছনে তাকাতেই দেখি একি! একদল লাঠিয়াল আমাদের দিকে ছুটে আসছে। হিংস্র গতিতে। যে যার মতো দৌঁড়ে পালানোর আপ্রাণ চেষ্টা চলছে তখন। আমরাও একইরকম সন্ত্রস্ত। আমি আর সালমান৷ বেসামাল হয়ে ফুটপাতের ওপর পড়ে গেলো ও। আমি টেনে তুললাম। শেষে তাল সামলাতে না পেরে আমিও পড়ে গেলাম। হাতের এক জায়গায় ছিলিয়ে গেলো। তবুও উঠে দাঁড়াতে হবে আমাকে। আমি উঠে দাঁড়ালামও। এই ধাক্কাধাক্কি আর তুলকালামে চশমা ভেঙে হাতে চলে এলো৷ আহ! দুনিয়াটাকে স্পষ্ট দেখতে আমার রবের দেয়া অনুগ্রহ!
আমরা দৌঁড়াচ্ছি। লাঠিয়াল বাহিনী লাঠিচার্জ করছে। পাশের বৃদ্ধের গায়ে থাপ্পড় বসালে তিনি "ইহুদীর বাচ্চা, কাফেরের বাচ্চা" বলে চেঁচিয়ে উঠলেন। বললেন, "মুসলমানগো মিছিলে বাঁধা দেস, আর অন্যদের মিছিলে বাঁধা দেস না, ইহুদীর বাচ্চারা"! বৃদ্ধের ক্ষোভ চরমে, আমাদেরও একই অবস্থা।
এরা একটা জাতি, জনগণের গালিগালাজ আর ভর্ৎসনা-ক্লান্ত হয়েও জমিনে দাঁড়িয়ে আছে যারা। শুনেছি এই বাহিনীর কোনো দল-মত থাকতে নেই। ক্ষমতার পালাবদলে কুরসীওয়ালাদের সামনে নতশিরে সমর্পিত হওয়াই এদের কাজ। তাই বলে এমন স্বৈরাচারী? এমন অরাজকতা? ইজতিমার ময়দানের সেই ঐতিহাসিক দাঙ্গায়ও এদের নির্মোহ সম্পৃক্ততা দেখে এসেছি কাছ থেকে। আজ আবারও দেখলাম। আমার এতসব দেখার বয়স কৈশোর ছেড়ে যৌবনের দিকে মোড় নিচ্ছে। আমি নাজির। আমি শুধু দেখি, দেখে যাই। এখনও দেখার অনেক কিছুই বাকি আছে যে!
রোজনামচা: ২৭.১১.২০২০ইং, শুক্রবার।

মন্তব্যসমূহ
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন