একটুখানি তাদাব্বুর
❝এরপর সে (ফেরাউন) বলল, আমিই তোমাদের সর্বশ্রেষ্ঠ মাবুদ। অত:পর আল্লাহ তাকে দুনিয়া ও আখিরাতের শাস্তিতে পাকড়াও করলেন। নিশ্চয়ই এতে রয়েছে শিক্ষা; যারা ভয় করে, তাদের জন্য❞।
সুরা নাযিয়াতের ২৪-২৬ নং আয়াতে অভিশপ্ত ফেরাউনের ব্যাপারে বর্ণিত হয়েছে উপরোক্ত বাণীগুলো। আল্লাহ তায়ালা ফেরাউনের ঔদ্ধত্য এবং খোদায়ি দাবীকে তুলে ধরে তার শাস্তির কথা এখানে উল্লেখ করেছেন। বলেছেন তার নির্মম পরিণতির কথা। আর “যারা ভয় করে, তাদের জন্য এতে রয়েছে শিক্ষা” কথাটি বলার মাধ্যমে সুকৌশলে ইঙ্গিত করেছেন মানবসম্প্রদায়ের প্রতি।
আয়াতত্রয়ে ফেরাউনের যেই উভজাগতিক শাস্তির কথা তুলে ধরা হয়েছে, তার একটি, অর্থাৎ আখেরাতের শাস্তির বিষয়টি তো সুনিশ্চিত। খোদায়ি দাবীদার একজনের জন্য যেই শাস্তি প্রযোজ্য হওয়ার কথা, তার তা-ই হবে। কিন্তু দুনিয়াবি শাস্তিটি কী, কিছু নিজস্ব ভাবনানুযায়ী আমি পাঠকের দৃষ্টি সেই দিকেই আকর্ষিত করতে চাচ্ছি।
মারা গেলে হিন্দুধর্মে হিন্দুয়ানা পদ্ধতিতে শবদেহকে চিতায় রেখে দাহ করা হয়। মুসলিম সামাজের মৃত ব্যক্তিকে, এমনকি ইহুদী-নাসারাদেরকেও তাদের রেওয়াজ অনুযায়ী মাটি দেওয়া হয়। অগ্নিদগ্ধ ব্যক্তি জ্বলেপুড়ে ছাঁই হয়ে যায় এবং মাটির কোলে সমর্পিত ব্যক্তিটি নিয়মানুযায়ী মাটির সাথে মিশে যায়। এ হলো মাটি ও আগুনের সভ্যতা। এই-ই হলো চিরসত্য।
কিন্তু ইতিহাসের এমন এক ব্যক্তি রয়ে গেছে, মারা যাবার পরেও যাকে আগুন বা মাটির এই বিরূপ আচরণ থেকে মুক্ত রাখা হয়েছে। সেই ব্যক্তিটিই হচ্ছে অভিশপ্ত ফেরাউন। যার গায়ে অগ্নিসংযোগ না করে এবং মাটি না দিয়ে স্রেফ একটি কাঁচের পেটিকায় প্রদর্শন করে রাখা হয়েছে। যদি সে অগ্নিদগ্ধ হয়ে কিংবা মাটির সাথে মিশে যেয়ে শাস্তি না-ই পাবে, তাহলে আল্লাহ তাকে দেওয়া দুনিয়াবি কোন শাস্তিটির বিষয়ে অবগত করে মানবসম্প্রদায়কে শিক্ষাগ্রহণের প্রতি ইঙ্গিত করলেন? কোন শাস্তিটিকে শিক্ষার উপকরণ হিসেবে আখ্যায়িত করলেন?
আমার ছোটভাই ইউনুসকে আমি মাঝেমধ্যেই পূর্ববর্তী বিভিন্ন ওয়াক্বেয়া শোনানোর মাধ্যমে ওর মনোযোগ আকর্ষণের চেষ্টা করি। আল্লাহর সাথে দ্রোহের পরিণতি কতো যে ভয়াবহ হতে পারে, এই বিষয়টা বুঝিয়ে একদিন ওর সামনে ফেরাউনের কথা তুললাম। এই অভিশপ্তের কথা উঠতেই মনে হলো, যেহেতু ফেরাউনকে দেখানোর সুযোগ আছেই, সেহেতু দেখানো যাক। খোদায়ি দাবী তো দূরের কথা, আল্লাহর কথা অমান্যের প্রতিফল যে কতোটা জোরালো হতে পারে, অমান্যকারী ব্যক্তি কতো যে ধিক্কৃত হতে পারে, এটুকুই বোঝানো ছিল আমার উদ্দেশ্য।
ইউটিউবে ফেরাউন লিখে সার্চ করতেই ভেসে ওঠা থামনেইলগুলো দেখে হঠাৎই ও আমার থেকে ছিঁটকে পড়ার মতো একহাত দূরে সরে গেল। চোখেমুখে ভয় নিয়ে বলল, “আল্লা... ভূত”! ওর এরকম অনাকাঙ্ক্ষিত আচরণে আমার ভেতরেও ভয় কাজ করতে লাগল। এরকম ছোটবাচ্চাকে ফেরাউনের অভিশপ্ত চেহারা দেখানোরই-বা কী দরকার ছিল–ভেবে অনুশোচিত হলাম। ওর ভয়ার্ত চোখমুখ দেখে মনে হচ্ছিল আমি ওকে এ দেখিয়ে ভালো করিনি।
ওর ভয়ের কথা স্মরণ হলেই মনে পড়ে যায় ছোটবেলায় আমারও ফেরাউন দেখার কথা। প্রথম যখন একে দেখেছিলাম, তখন থেকে বেশ কয়েকদিন নাগাদ শুধু সেই অভিশপ্ত ও ভর্ৎসনা-ক্লিষ্ট চেহারা আমার মাথায় ঘুরপাক খেয়েছে। থেকে থেকে শুধু সেই ভয়ানক চেহারাটাই স্মৃতিপটে ভেসে এসেছে। কতো নিকৃষ্ট হলে একজন মানুশকে এভাবে ভয় পেতে পারে অন্য মানুশ, ভাবা যায়?
শুধুমাত্র পাগলরা ব্যতিত মানবজাতির প্রতিটি সদস্য নিজেকে সবার সামনে সুন্দর করে মেলে ধরতে চায়। লোকচক্ষুর অন্তরালে মানুশ খুন করা অমানুশেরাও চায় নিজেকে একজন সুশীল হিসেবে সমাজের বুকে প্রতিষ্ঠিত করতে৷ বয়সের ভারে ন্যুব্জমান পুরুষ কিবা নারীরাও চায় না নিজের অস্তগামী সৌন্দর্যের আলোচনা কেউ করুক। চায় তার অসীম সৌন্দর্যের চর্চা হোক আশেপাশের সবখানে। কিন্তু কে চায় তাকে দেখে অন্যে দৌড়ে পালাক? কে চায় তাকে দেখে জোয়ান-বুড়ো, শিশু-কিশোর ভয়ে মায়ের আঁচলে মুখ লুকাক?
এখন তবে ফেরাউনের দুনিয়াবি শাস্তির বিষয়টা আমরা বুঝতে পারি। তার শাস্তিই হলো মানুশেরা তার চেহারা দেখে ভয়ে মুখ ফিরিয়ে নেবে এবং তার ভয়ঙ্কর ভয়াবহ পরিণতি দেখে আফসোস করবে। প্রার্থনা করবে খোদাদ্রোহিতার মতো অভিশাপ থেকে বেঁচে থাকার। তাফসিরে কুরতুবিতে (সুরা নাযিয়াতের ২৫ নং আয়াতের তাফসিরে) ‘নাকাল’ শব্দের অর্থে ঠিক এই কথাটাই বলা আছে। বলা আছে, ‘নাকাল’ শব্দের অর্থ দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি, যা দেখে অন্যরাও আতঙ্কিত হয়ে যায় এবং শিক্ষা পায়।
যুগে যুগে যারাই এই পাপাচারিতায় নিজেকে নিয়োজিত করেছিল, তাদের সবারই শাস্তি ছিল অসহনীয় ও দৃষ্ঠান্তমূলক। আল্লাহ আমাদের সকলকে এই ভয়াবহতা থেকে রক্ষা করুন!
ইসহাক নাজির, রাত ১০:২৬ মিনিট
১৬.০৮.২০২১ ইং, সোমবার
মন্তব্যসমূহ
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন