আত্মহত্যা : যে জীবন ধূলিময়
আত্মহত্যা আমাদের সমাজে একটি সহজ ও বহুল প্রচলিত শব্দ। আত্মহত্যা প্রায় প্রতিটি যুগেই প্রাসঙ্গিক ছিলো। এমনকি এখনও আছে। এই আত্মহত্যা নিয়ে আমাদের কৌতুহলের শেষ নেই। রবের দেয়া কৃতজ্ঞতাময় জীবন যখন অকৃতজ্ঞতায় পরিণত হয়, এই মহামানিক্য যখন অমূলক মনে হয়, তখনই কেবল মানুষ বেছে নেয় এই হীন ও জঘন্যতম পথ।
আত্মহত্যা অর্থ হলো স্বয়ং নিজেকে হত্যা করা। আরেকটু গুছিয়ে এবং সুন্দর করে বললে, সহস্তে আল্লাহর দেয়া আমানতের খেয়ানত করা। যে দায়িত্ব আমার নয়, ঔদ্ধত্যের সাথে তা আদায় করা এবং ছিনিয়ে নেয়া। নিজের প্রাণনাশের কাজ নিজেই করাটা তো একরকম নিজের প্রাণ নিজে ছিনিয়ে নেয়াই বটে।
উইকিপিডিয়ার ভাষ্যমতে, আত্মহত্যা বা আত্মহনন (ইংরেজি: Suicide) হচ্ছে কোনো ব্যক্তি কর্তৃক ইচ্ছাকৃতভাবে নিজের জীবন বিসর্জন দেয়া বা স্বেচ্ছায় নিজের প্রাণনাশের প্রক্রিয়াবিশেষ। ল্যাটিন ভাষায় “সুই সেইডেয়ার” থেকে সুইসাইড বা আত্মহত্যা শব্দটি এসেছে, যার অর্থ হচ্ছে নিজেকে হত্যা করা। যখন কেউ আত্মহত্যা করেন, তখন জনগণ এ প্রক্রিয়াকে “আত্মহত্যা করেছে” বলে প্রচার করে।
“মানুষ আত্মহত্যা কেনো করে”, এ নিয়ে রয়েছে নানান ধরনের অভিজ্ঞতা। আছে বিচিত্র গবেষণাও। আসল কথা হলো, কেউ আত্মহত্যা করতে তেমন কোনো কারণের প্রয়োজন হয় না। যেহেতু মানুষ স্বভাবগত বৈচিত্র ও সত্তাগত রুচিবোধ লালন করে, যেহেতু কোনো একটা বিষয়ে দুইজনের দৃষ্টিভঙ্গির ভিন্নতা থাকতে পারে, সেহেতু মানুষ যে কোনো কারণেই আত্মহত্যা করতে পারে। একজনের কাছে একটা বিষয়ের যৌক্তিকতা এবং আরেকজনের অযৌক্তিকতা থাকাটা যেমন স্বাভাবিক, ঠিক তেমনি আত্মহত্যার ব্যাপারেও মানুষ ভিন্ন ভিন্ন কারণ অবলম্বন করতে পারে।
ইতালির কবি ও ঔপন্যাসিক সেসার পাভিস এক প্রশ্নের উত্তর দিতে গিয়ে ঠিক এই কথাটাই বলেছেন। তিনি বলেছেন এভাবে, “আত্মহত্যা করার জন্য কারো কারণের অভাব হয় না।” তাত্ত্বিকরা এ কারণগুলোকে ব্যাখ্যা করার চেষ্টা করেছেন নানাভাবে। তাই গড়ে উঠেছে একাধিক তত্ত্ব। [১]
বাংলাদেশে যৌতুক ও পারিবারিক নির্যাতন, আবেগ নিয়ন্ত্রণের ব্যর্থতা, দাম্পত্য-কলহ, উত্ত্যক্তকরণ (যৌন নির্যাতন), প্রেম-বিরহ ও পরীক্ষায় ব্যর্থতা, দারিদ্র্য বেকারত্ব (অভাব-অনটন), আত্মহত্যার উপকরণের সহজপ্রাপ্যতা, মানসিক অসুস্থতা ইত্যাদি কারণে বেশির ভাগ আত্মহত্যার ঘটনা ঘটে থাকে। প্রচারমাধ্যমে আত্মহত্যার সংবাদের অতিপ্রচার, অপপ্রচার বা অদায়িত্বশীল সংবাদ পরিবেশনের কারণেও কখনো কখনো আত্মহত্যার ঘটনা বাড়তে পারে। [২]
এক গবেষণায় প্রমাণিত যে মানসিক অসুস্থতা, বিশেষ করে বিষণ্নতা, ব্যক্তিত্ব ও আবেগের সমস্যা, মাদকাসক্তি আর সিজোফ্রেনিয়ায় যাঁরা ভুগছেন; তাঁদের মধ্যে আত্মহত্যার প্রবণতা বেশি। [৩]
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্লিনিক্যাল সাইকোলজি বিভাগের প্রধান ড. মো. কামরুজ্জামান মজুমদার বলেন, “আত্মহত্যার অনেক কারণ থাকতে পারে। তার মধ্যে একটি হলো- মানসিক চাপ। প্রত্যেকেরই কিছু না কিছু মানসিক চাপ থাকে। চাপটা বেশি হয়ে গেলে কারো কারো মনে হয়, তিনি আর সমস্যার সমাধান করতে পারছেন না। পরিস্থিতির সঙ্গে খাপ খাওয়াতে পারছেন না। তখন জীবন থেকে পালানো বা আত্মহত্যার পথটাই তার কাছে সহজ মনে হয়”।
তিনি আরও বলেন, “বিষণ্নতায় যারা ভোগেন, তাদের মধ্যেও আত্মহত্যার প্রবণতা থাকে। কারণ জীবন নিয়ে তাদের মধ্যে প্রচণ্ড নেতিবাচক ধারণা কাজ করে। ছেলেবেলা থেকে যাদের নিজের ওপর নিয়ন্ত্রণ থাকে না তাদের মধ্যেও আত্মহত্যার প্রবণতা কাজ করে।” [৪] সবচেয়ে বেশি আত্মহত্যা সংঘটিত হয় বিষন্নতা বা ডিপ্রেশনের জন্য।
তাহলে এবার আলোচনা করা যাক ‘ডিপ্রেশন কী’, এ নিয়ে।
ডিপ্রেশন একটি ভয়াবহ মানসিক ব্যাধি যা একজন মানুষকে সবার অজান্তে তিলে তিলে শেষ করে দেয়। বর্তমান বিশ্বে প্রায় তিনশ মিলিয়ন (১ মিলিয়ন=১০ লাখ) ডিপ্রেশনের রোগী রয়েছেন। একটি গবেষণায় দেখা গেছে, প্রতি ৫ জনের ১ জন মানুষ কোনো না কোনো ধরনের ডিপ্রেশন বা এনজাইটিতে ভুগছেন।
ডিপ্রেশনের ভয়াবহ দিকটি হচ্ছে আক্রান্ত রোগীরা নীরবে-নিভৃতে আত্মহত্যা করে বসেন। বিশ্বের ১৫ থেকে ২৪ বছর বয়সী তরুণ-তরুণীদের মৃত্যুর প্রধান কারন ডিপ্রেশন জনিত আত্মহত্যা। ডিপ্রেশন বেশি দেখা যায় মধ্য ও নিম্ন আয়ের দেশগুলোতে।
বাংলাদেশের শতকরা ১৮ থেকে ২০ ভাগ মানুষ কোনো না কোনো প্রকারের ডিপ্রেশন বা এনজাইটিতে ভুগছেন। পরিবারের অনেকে হয়তো জানেন-ই না যে, তারা ডিপ্রেশনের রোগী। আমাদের অনেকেই আছেন ডিপ্রেশন সম্পর্কে অজ্ঞ এবং কেউ কেউ ডিপ্রেশনকে রোগই মনে করেন না।
ডিপ্রেশন থেকে ডায়াবেটিস ও হাইপ্রেশার হয়ে থাকে। আবার উল্টোটাও হয়। ডিপ্রেশন শরীরের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা কমিয়ে দেয়। অনেক সময় বৃদ্ধ, শিশু, কিশোর এমনকি সন্তান সম্ভবা মা বা প্রসূতি মায়েদেরও ডিপ্রেশন হয়, এবং তারা আত্মহত্যার পথ বেছে নেন।
বিশ্বের অনেক বিখ্যাত ব্যক্তি ডিপ্রেশনের রোগী ছিলেন। তাদের মধ্যে চাঁদে ভ্রমণকারী এডুইন অলড্রিন জুনিয়র, প্রেসিডেন্ট আব্রাহাম লিংকন, সাহিত্যিক আর্নেস্ট হেমিংওয়ে, উইস্টন চার্চিল, বিখ্যাত ‘হেরি পোর্টার’-এর লেখিকা জে কে রওলিং, গ্রেমি এওয়ার্ড খেতাব প্রাপ্ত গায়িকা শেরিল ক্রো, যুক্তরাস্ট্রের সাবেক ভাইস প্রেসিডেন্ট আল গোরের স্ত্রীও রয়েছেন।
মার্কিন নভোচারী অলড্রিনের দাদিও ডিপ্রেশনের রোগী ছিলেন এবং তিনি আত্মহত্যা করেন। হেরি পোর্টারের লেখিকা রওলিং ডিপ্রেশনের জন্য মাঝেমধ্যে আত্মহত্যার কথা ভাবতেন।
ডিপ্রেশনের রোগীরা আত্মহত্যা করেন বেঁচে থাকার কোন মানে খুঁজে পেতে ব্যর্থ হয়ে। ডিপ্রেশন নিয়ে লজ্জা নয়। ডিপ্রেসিভ রোগীর প্রতি সহমর্মিতার হাত বাড়িয়ে দিন, তাদের সঙ্গে ডিপ্রেশন নিয়ে আলাপ করুন, এবং তাদের চিকিৎসার জন্য যথাযথ পদক্ষেপ নিন।
ডিপ্রেশনের প্রধান কিছু লক্ষণ-
সারাক্ষণ মনমরা হয়ে থাকা, উৎসাহ উদ্যম হারিয়ে ফেলা, ঘুম কমে যাওয়া বা বেড়ে যাওয়া, রুচি কমে যাওয়া বা বেড়ে যাওয়া, ওজন কমে যাওয়া বা বেড়ে যাওয়া, কাজকর্মে শক্তি না পাওয়া, মনোযোগ হারিয়ে ফেলা, মেজাজ খিটখিটে হয়ে যাওয়া, নিজেকে নিঃস্ব ও অপাঙক্তেয় মনে করা, অযাচিত অপরাধবোধ এবং আত্মহত্যার কথা বলা, ভাবা ও চেষ্টা করা।
এ লক্ষণগুলো টানা দু’সপ্তাহের বেশি থাকলে তাকে মেজর ডিপ্রেসিভ ডিসওয়ার্ডার এর রোগী বলা হয়, এবং তাকে আত্মহত্যার ঝুঁকিতে আছেন বলা যায়। [৫]
এ তো গেলো আত্মহত্যার কারণসমূহ, যে সকল কারণে মানুষ আত্মহত্যা করে। এখন শোনাবো আত্মহত্যার পরিসংখ্যান। যা সত্যিই অবাক করার মতো তথ্য। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার ‘প্রিভেন্টিং সুইসাইড: অ্যা সোর্স ফর মিডিয়া প্রফেশনালস ২০১৭’ জরিপ বলছে, ‘প্রতিবছর বিশ্বে ১০ লাখ মানুষ আত্মহত্যা করে। প্রতি ৪০ সেকেন্ডে আত্মহত্যার ঘটনা ঘটে ১ টি!’ যা যে কোনো যুদ্ধে নিহতের সংখ্যার চাইতেও বেশি! (আরেকবার পড়ুন পরিসংখ্যানটা। প্রতি ৪০ সেকেন্ডে একজন!)
আরও একটি জরিপ বলছে, ‘গত ৪৫ বছরে আত্মহত্যার ঘটনা ৬০ শতাংশ বেড়েছে। বিশ্বে বর্তমানে ১৫ থেকে ৪৪ বছর বয়সী মানুষের মৃত্যুর প্রধান তিনটি কারণের মধ্যে একটি হচ্ছে আত্মহত্যা। [৬]
এ তো ছিলো বিশ্বের কথা। এবার বলি বাংলাদেশের কথা। মনোযোগ ধরে রাখুন! বাংলাদেশে ২০১১ সালের হিসেবে ১৯ হাজার ৬৯৭ জন আত্মহত্যা করেছে। অন্য একটি প্রতিবেদনে দেখা যায় ২০০২ থেকে ২০০৯ পর্যন্ত মোট ৭৩ হাজার ৩৮৯ জন আত্মহত্যা করেছে! কিন্তু প্রায় ৬৫ লাখ মানুষ আত্মহত্যার ঝুঁকিতে আছে, যাদের বেশির ভাগই অল্প বয়সী এবং প্রায় ৮৯ শতাংশ নারী। [৭]
ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশ (ডিএমপি) দেশে আত্মহত্যার ঘটনার তথ্য সংরক্ষণ করে। তাদের তথ্য অনুযায়ী, ২০১৬ সালে দেশে আত্মহত্যা করেন ১০ হাজার ৭৪৯ জন। আর ২০১৭ সালের নভেম্বর পর্যন্ত এ সংখ্যা ছিল ১০ হাজার ২৫৬ জন। বছর শেষে এ সংখ্যা নিশ্চিতভাবেই বেড়েছে। এ হিসাব অনুযায়ী, দেশে প্রতিদিন গড়ে ২৯ জনের বেশি (!) আত্মহত্যা করছেন। যাদের মধ্যে তরুণ-তরুণীর সংখ্যাই বেশি। [৮]
পাশ্চাত্যের সংস্কৃতিতে মধ্য বা শেষ বয়েসী মানুষদেরকে সন্তানদের থেকে দূরে রাখা হয়। সন্তানেরা উৎসাহী হয়েই এমনটা করেন। এ সময়ে বৃদ্ধাশ্রম হয় তাদের নিবাস। তাদের কালচারে বিষয়টা খুবই স্বাভাবিক। আমাদের বাঙালিয়ানা স্বভাব, ধর্ম এবং দেশের দৃষ্টিকোণ থেকে যা একটি গর্হিত অপরাধ। অথচ আমাদের দৃষ্টিতে যা অপরাধজনক, তাদের কাছে তাইই অবাক করার মতো। তাই পাশ্চাত্যে এই বয়েসী মানুষেরা একাকিত্বে ভোগেন বিধায় সেখানে ৪০ থেকে ৫০ বছর বয়েসী একাকী পুরুষদের মধ্যে আত্মহত্যার প্রবণতা বেশি দেখা যায়।
এক ধরণের গবেষণায় দেখা গিয়েছে, বাংলাদেশে প্রতিবছর প্রতি লাখে ৩৯ দশমিক ৬ জন আত্মহত্যা করে। বহির্বিশ্বে ছেলেদের মধ্যে আত্মহত্যার হার বেশি হলেও বাংলাদেশে ব্যতিক্রম। বাংলাদেশে নারীদের মধ্যে আত্মহত্যার প্রবণতা বেশি এবং তা সাধারণত অল্প বয়সী টিন এজারদের মধ্যে। [৯]
দুই ধরনের আত্মহত্যার ঘটনা সাধারণত ঘটে থাকে। এক. আগে থেকে পরিকল্পনা করে, আয়োজন করে, সুইসাইড নোট লিখে আত্মহত্যা করা। যাকে বলা হয় ডিসিসিভ সুইসাইড। দুই. অনেকে হুট করে আবেগের রাশ টানতে না পেরে আত্মহত্যা করে ফেলেন, যাকে বলা হয় ইমপালসিভ সুইসাইড। ডিসিসিভ সুইসাইড যাঁরা করেন, তাঁরা আগে থেকেই কিন্তু আত্মহত্যার ইঙ্গিত দিয়ে থাকেন। এ ধরনের মানুষ আত্মহননের আগে যেভাবে সেটা প্রকাশ করেন, তার মধ্যে রয়েছে—
🔹তাঁরা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে মৃত্যু আর আত্মহত্যা নিয়ে নিজের ইচ্ছার কথা জানান দেন।
🔹আত্মহত্যা বা মৃত্যুবিষয়ক গান-কবিতা লিখতে, শুনতে বা পড়তে থাকেন।
🔹নিজের ক্ষতি করেন। প্রায়ই এরা নিজের হাত-পা কাটেন বা বেশি বেশি ঘুমের ওষুধ খান।
🔹মনমরা হয়ে থাকেন। সব কাজে উৎসাহ হারিয়ে ফেলেন, নিজেকে দোষী ভাবেন- এগুলো বিষণ্নতার লক্ষণ; যা থেকে আত্মহত্যা ঘটে।
🔹মাদকাসক্তি বা ইন্টারনেটে মাত্রাতিরিক্ত আসক্তি আত্মহত্যায় সহায়তা করে।
🔹সারা রাত জেগে থাকা আর সারা দিন ঘুমানো।
🔹নিজেকে গুটিয়ে রাখা, সামাজিক অনুষ্ঠানে অংশ না নেওয়া।
🔹পড়ালেখা, খেলাধুলা বা শখের বিষয় থেকে নিজে দূরে থাকা। [১০]
কিছুদিন আগে একটি কিশোর বাবা-মায়ের ঝগড়া মেটাতে গিয়ে সুইসাইড করলো। বলিউডের সাড়াজাগানো নায়ক সুশান্ত সিং রাজপুত চলে গেলো বিত্ত-বৈভব-খ্যাতি ছেড়ে। নেপালে মার্চ থেকে শুরু হওয়া লকডাউনের প্রথম ৭৪ দিনে আত্মহত্যা করেছে ১,২২৭ জন, ভারতে ৯ জন শ্রমিক কাজ হারিয়ে একসঙ্গে কুয়ায় লাফিয়ে পড়ে মারা গেলো। ১২ বছরের বাচ্চাকে বাবা বকেছে বলে রাগে-দু:খে বাচ্চাটি ফ্যানে ঝুলে পড়লো। এসএসসিতে ভালো নম্বর না পাওয়ায় ১০ জন কিশোর আত্মহত্যা করলো। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ১০ থেকে ১২ জন ছাত্র-ছাত্রী পরপর আত্মহত্যা করলো। বাবার বাড়ি থেকে যৌতুক দিতে না পারায় দুঃখে গৃহবধূ গলায় ফাঁস দিলো।
এদের চলে যাওয়ার পেছনে বিভিন্ন কারণ থাকলেও, মূল কারণ কিন্তু একটাই, আর সেটা হচ্ছে চাপ, বিষণ্ণতা এবং হতাশা, যা তারা বহন করতে পারেনি। [১১]
এবার নিজ কানে শোনা দুটো সত্য ঘটনা বলি। বরগুনার সদর থানায় একবার আমরা ত্রাণ সহায়তার জন্য গেলাম। সেখানেই শুনলাম আত্মহত্যার বিস্ময়কর-মর্মান্তিক এক ঘটনা। স্বামী ফুটবল বিশ্বকাপের সময় অর্জেন্টিনার খেলা দেখছিলেন। স্ত্রী ভিন্ন কিছু দেখবেন বলে রিমোর্ট চাইলেন। স্বামী রিমোর্ট দিতে নারাজ। তাই কথা কাটাকাটির এক পর্যায়ে স্ত্রী রান্নাঘরে গিয়ে শরীরে কেরোসিন ঢেলে নিজেকে চিরতরে শেষ করে দিলেন। আহা জীবন! সামান্য রিমোর্টের জন্য ফুলের মতো দুটো সন্তান রেখে যে চলে যায়, সে ফিরবে কি?
আরেকটা ঘটনা বলি৷ জানি না এটাও সহ্য করার ক্ষমতা আমাদের হবে কিনা। ঘটনাটা ময়মনসিংহ হালুয়াঘাটের আমার ঘনিষ্ঠতম এক বন্ধুর বাড়ির পাশের। তারই মুখে শোনা। এক মাদ্রাসাপড়ুয়া বাচ্চা। বয়স দশ কি এগারো। সে দেশের প্রথিতযশা এক ইসলামি সঙ্গিতাঙ্গনের দারুণ ভক্ত। বাবার ফোনে তাদের নতুন নতুন ভিডিও সবসময়ই দেখে সে। তার হঠাৎ সাধ জেগেছে পছন্দের প্রিয় শিল্পী গোষ্ঠির (এখানে ইচ্ছে করেই তাদের নামটা এড়িয়ে যাচ্ছি) মতো সাজবে। তাদের মতো জোব্বা বানাবে। পাগড়ি পরবে। এ নিয়ে বাবাকে প্রচণ্ডরকম বিরক্ত করেছে এ কয়দিনে।
বাবা দিনমজুর। নূন আনতে পান্তা ফুরোয় অবস্থা। শেষমেশ খুব কষ্টে একটা জোব্বা ছেলেকে বানিয়ে দিলেন। জোব্বা পরার পর পায়ের দিকে তাকিয়ে ছেলে অসন্তুষ্ট হলো। এই রংবেরঙের জোব্বার সাথে তার স্যান্ডেল মানাচ্ছে না দেখে আবারো কেডস কেনার বায়না ধরলো। বাবাও কমদামি কেডস কিনে দিতে রাজি হলেন। কিন্তু তাতে ছেলের চলবে না। তার দরকার হাজার/বারশোর কেডস।
ছেলের তীব্র জেরার মুখে বাবা এক সময় কিনে দিতে অস্বীকৃতি জানালেন। এর তিন/চারদিন পর পাশের গ্রামের বিয়ের বাড়িতে যাবার সময় মা খুব করে সাধলেন। ছেলেটা গেলো না। মা চলে যাবার পর মামাতো-চাচাতো ভাই বোনেরাও এসে সাধাসাধি করলো। সে তাও গেলো না। একরকম ধাক্কা দিয়ে ভাই বোনদের ঘর থেকে বের করে দিয়ে ভেতর থেকে খিল এঁটে দিলো।
মা বিয়ে বাড়ি থেকে ফেরার পর অনেক ডাকাডাকি সত্ত্বেও ভেতর থেকে কোনো সাড়াশব্দ না পেয়ে দরজা ভাঙতে বাধ্য হলেন। এর পরের ঘটনা আমাদের বোঝার বাকি নেই। ছেলেটাকে ফ্যানের সাথে ঝুলন্ত অবস্থায় পাওয়া গেলো।
এই যে চাওয়া পাওয়ার প্রশ্নে জীবনটাকে মূল্যহীন মনে হয়, এ কেনো? এর পেছনের কারণ কারো জানা নেই। প্রতিটি আত্মহত্যার পেছনে ব্যক্তির নিজস্ব কিছু কারণ থাকে। নিজস্ব কিছু ভাবনা ও চিন্তাধারা থাকে। প্রতিটি মানুষ রুচিবোধগতভাবে যেহেতু আলাদা, সেহেতু আবেগ-অনুভূতির দিক দিয়েও আলাদা। আমি যেভাবে পৃথিবীকে দেখছি, অবলোকন করছি, আরেকজন সেই দৃষ্টিতে দেখবে না। অবলোকন করবে না৷ তাই কেউ কেনো সুইসাইড করলো, বলাটা খুবই কঠিন। ডাক্তাররা কারণ বের করার চেষ্টা করেন, কিন্তু একজন মানুষের মনের মধ্যে ঠিক কী ঘুরছে এটা বোঝা সহজ নয়। কেনো সে এই অসময়ে আত্মহত্যা করলো এটা জানাও প্রায় অসম্ভব।
স্কটিশ (স্কটল্যান্ডের) দার্শনিক ডেভিড হিউম সেই ১৭ শতকে তার ‘আত্মহত্যা’ বিষয়ক প্রবন্ধে লিখে গেছেন, “আমি বিশ্বাস করি কোনো মানুষ কখনোই তার জীবনকে ছুঁড়ে ফেলে দিতে পারে না, যতক্ষণ পর্যন্ত সেই জীবনটা তার কাছে মূল্যবান থাকে”। তাহলে নির্ধারিত করে একটা বিষয়ই বলা যায়, যখন জীবন স্বীয় আবেগ অনুভূতির সামনে ফিকে হয়ে আসে, যখন জীবন যন্ত্রণাদগ্ধ ও বিষাদে হয়ে আসে, যখন বিশাল এই জগতের কাছে নিজেকে বড়ই অপাংক্তেয় মনে হয়। মনে হয় ‘আমার কাছে জগতের চাওয়া-পাওয়ার কিছুই নেই’ কিংবা মনে হতে পারে ‘আমি অক্ষম’। ঠিক তখনই মানুষ নিজেকে ধ্বংসের উৎসবে মেতে ওঠে। যাকে অন্যেরা আত্মহত্যা বলে স্বীকৃতি দেয়।
আমি মনে করি, এবং শুধু মনে করিই না বরং এটাই বাস্তব। যে মারা যায় তার মৃত্যু তার পরিবারের ওপর ভয়াবহ প্রভাব রাখে। তার স্বজন-পরিজন একটা দুর্বিষহ সময়ের মধ্য দিয়ে যায় এবং একটা উত্তরবিহীন প্রশ্ন, অতৃপ্ত মন এবং গভীর শূন্যতা নিয়ে সারাটা জীবন কাটিয়ে দেয়। যুগযুগান্তরে তাদের অগোচরে আঙুল তোলে দেখানো হয়, ‘তার অমুক আত্মহত্যা করেছিলো’। এটা হচ্ছে এ কারণেই যে, তার এই চলে যাওয়াটা তার একার বিষয় নয়। সবাইকে ঘিরেই একটা সমাজ। আর সমাজ কারো একার নয়।
আমাদের ধর্মের নাম ইসলাম। শুধু ইসলামই কেনো, আত্মহত্যাকে কোনো ধর্মই কখনো সমর্থন করে না। আর শুধু ধর্মই না, কোনো সুস্থ বিবেকসম্পন্ন মানুষই এটাকে সমর্থন করতে পারে না। আমরা মনে করি ইসলাম ব্যতীত সকল ধর্মই হলো মানবরচিত। মানবরচিত ধর্মের সংবিধানও মানব লিখিত। বলা বাহুল্য, মানবরচিত এসব ধর্মেও আত্মহত্যা কিংবা আত্মহত্যাকারীকে সমর্থন করার কথা পাওয়া যায় না।
পরম দয়ালু ও অসীম ক্ষমতাধর মহাগ্রন্থ আল কুরআনের সুরা নিসার ২৯-৩০ নং আয়াতে বলেছেন, ❝তোমরা নিজেদের হত্যা কোরো না, নিশ্চয়ই আল্লাহ তোমাদের প্রতি পরম দয়ালু এবং যে কেউ সীমালঙ্ঘন করে অন্যায়ভাবে আত্মহত্যা করবে, তাকে আমি অগ্নিদগ্ধ করবো❞।
সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ দয়ালু রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, ❝যে কেউ পাহাড় থেকে পড়ে আত্মহত্যা করবে, সে জাহান্নামের আগুনে চিরস্থায়ীভাবে পাহাড় থেকে পড়ার অনুরূপ শাস্তি ভোগ করতে থাকবে। যে ব্যক্তি বিষপানে আত্মহত্যা করবে, সে চিরস্থায়ীভাবে জাহান্নামের আগুনে বিষপানের আজাব ভোগ করতে থাকবে। আর যে কেউ কোনো ধারালো কিছু দিয়ে আত্মহত্যা করবে, সে চিরস্থায়ীভাবে জাহান্নামের আগুনে তা দ্বারা শাস্তি ভোগ করতে থাকবে❞। [১২]
এমনকি রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম উম্মতের প্রতি এতো দয়ালু হওয়া সত্ত্বেও নিজে কখনো কোনো আত্মহত্যাকারীর জানাজায় শরিক হতেন না। তাই জীবনে যতই ঝড় আসুক, তা মহান আল্লাহর ওপর ভরসা রেখে কাটিয়ে উঠতে হবে। আত্মহত্যার মতো ঘৃণ্য পথ বেছে নেওয়া যাবে না। যারা আল্লাহর ওপর আস্থা রাখে না, তারাই এ ধরনের পথ বেছে নিতে পারে। মুমিন তো সর্বাবস্থায়ই মহান আল্লাহর কাছে সাহায্য চাইবে।
অনেক সময় হতাশা চরমে পৌঁছলে, বিপদে অধৈর্য হয়ে গেলে এবং অনিয়ন্ত্রিত অভিমানে আত্মহত্যার পথে মানুষ প্ররোচিত হয়ে থাকে। অথচ ইসলামে এই কারণগুলোর সান্ত্বনা ও তৎপরবর্তী প্রতিদানের কথা ঘোষিত হয়েছে। আল্লাহ তা’আলা ইরশাদ করেন, ❝হে আমার বান্দারা! তোমরা যারা নিজেদের প্রতি অবিচার করেছো, তোমরা আল্লাহর অনুগ্রহ থেকে নিরাশ হয়ো না। নিশ্চয়ই আল্লাহ সব গুনাহ ক্ষমা করে দেন। সন্দেহ নেই, তিনিই ক্ষমাশীল, অতিশয় দয়ালু❞। (সুরা : জুমার, আয়াত : ৫৩)
অন্যত্রে পরম দয়ালু ও সর্বময় ক্ষমতার অধিপতি রাব্বুল আলামিন বলেছেন, ❝হে মুমিনগণ! তোমরা সালাত ও ধৈর্যের মাধ্যমে আল্লাহর সাহায্য কামনা করো। আল্লাহ তো ধৈর্যশীলদের সাথেই আছেন❞। (সুরা বাকারা -১৫৩)
আজ যারা আত্মহত্যার দিকে ধাবমান, ভেবে দেখুন, পৃথিবীটা কতো সুন্দর! কতো সুন্দর এই জীবন! কতো সুন্দর প্রিয় মানুষগুলো! সুন্দর তাদের মুখের হাসি। খিলখিল, মসৃণ, নয়নাভিরাম। সদ্য ভূমিষ্ঠ শিশুর অবাক করা চাহনি, হৃদয়হরনী প্রেয়সির মুখ, চিত্তাকর্ষিত গালের টোল! কতো সুন্দর! কতো সুন্দর!
একদিন না একদিন এই দুটো চোখ বন্ধ হবেই। স্বেচ্ছায় বন্ধ করার আগে একটু বন্ধ করে ভাবুন। তাকিয়ে দেখুন হৃদয়ের অলিগলি। দেখুন গর্ভধারিণী মায়ের মুখ, বাবার কষ্ট আর বোনের খুনসুটি। এসব কিছুই কি আপনাকে মোহাবিষ্ট করে না? আপনাকে কাছে ডাকে না? আপনার কি কোনোই পিছুটান নেই? একবেলা খেতে বসে দেখুন মায়ের আদর, বাবার স্নেহ। দেখুন প্রিয়ার ভালোবাসা কিংবা সন্তানের অবোধ আচরণ। আপনাকে ঘিরে তাদের মমতা দেখুন, আপনাকে নিয়ে তাদের ছন্দময় জীবন প্রত্যক্ষ করুন। আপনার চলে যাবার পরে যেই ছন্দের পতন ঘটবে। যেই ঘাঁয়ে মলম লাগানোর কেউ থাকবে না।
এই যে এতো মারামারি, এতো দাঙ্গা-হাঙ্গামা, সর্বাগ্রে এগিয়ে যাবার এই যে অসুস্থ প্রতিযোগিতা, এসব কেনো জানেন? পৃথিবীর এই অনিশ্চিত জীবনেও যেন একটু ভালো থাকা যায়। একটু স্বস্তির জীবন লাভের আশায়ই এসব ঝুট-ঝামেলা। অথচ আপনি কিনা এই স্বপ্নীল জীবনটাকে অকাতরে বিলিয়ে দিতে চাইছেন! কবিগুরু রবী ঠাকুর আকুল হয়ে বলেছিলেন, “মরিতে চাহি না আমি সুন্দর ভুবনে”। অথচ এই সুন্দর ভুবন ছেড়ে চলে যেতে আপনার এতোই তাড়া?
মার্কিন লেখক অ্যাডওয়ার্ড ডালবার্গ বলেন, “যখন কেউ উপলব্ধি করে, তার জীবনের কোনো মূল্য নেই। তখন সে আত্মহত্যা করে নতুবা ভ্রমণে বেড়িয়ে পড়ে। প্রথম কথা হচ্ছে, কোনো মানুষের জীবনই মূল্যহীন বা অর্থহীন হতে পারে না। তথাপি কেউ যদি তা মনে করেন, আমি চাইব, আত্মহত্যার পরিবর্তে তিনি ভ্রমণকেই বেছে নেবেন।”
তাই আসুন, ছোট্ট এ জীবনকে উপভোগ করি। নিজে সচেতন হই, অপরকেও সচেতন করে তুলি। এমনকি প্রয়োজনে সাইকিয়াট্রিস্ট বা মানসিক রোগ বিশেষজ্ঞের পরামর্শ নেই। তাছাড়া আরেকটি উপায় হলো, একাকিত্ব ভালো না লাগলে ভ্রমণে বের হয়ে পড়ি। কে জানে, হয়তো ঘুরতে ঘুরতেই খুঁজে পাওয়া যাবে জীবনের অর্থ! আত্মহত্যার প্রবণতামূলক এই ধূলিময় জীবন ছেড়ে আনন্দের সাথে বেঁচে থাকা যাবে আরো কিছু সকাল, আরো কিছু সন্ধ্যা!
======
সূত্রসমূহ-
[১] ১লা সেপ্টেম্বর ২০২০, jagonews24.com
[২], [৩] ৯ সেপ্টেম্বর ২০২০, প্রথম আলো, ডা. হেলাল উদ্দিন আহমেদ-এর কলাম।
[৪] ১লা সেপ্টেম্বর ২০২০, jagonews24.com
[৫] ১০ সেপ্টেম্বর ২০১৮, যুগান্তর, অনলাইন সংস্করণ।
[৬] ১লা সেপ্টেম্বর ২০২০, jagonews24.com
[৭] ১লা সেপ্টেম্বর ২০১৪, প্রথম আলো, অনলাইন সংস্করণ।
[৮] ১লা সেপ্টেম্বর ২০২০, jagonews24.com
[৯] ১০ সেপ্টেম্বর ২০১৮, যুগান্তর, অনলাইন সংস্করণ।
[১০] ৯ সেপ্টেম্বর ২০২০, প্রথম আলো, ডা. হেলাল উদ্দিন আহমেদ-এর কলাম।
[১১] ২৫শে জুন ২০২০, The Daily Star (বাংলা)।
[১২] সহিহ আল বুখারী, ৫৭৭৮ নং হাদীস।
======
ইসহাক নাজির, রাত ০১:২৯ মিনিট
১১.০৪.২০২১ ইং, রোজ রবিবার।

মন্তব্যসমূহ
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন