স্বপ্নের সাগরে...

হেফজখানার ছোট্ট পরিসর ভেদ করে কিতাবখানায় পা রাখতেই বুঝলাম আমি এক মহাসমুদ্রে এসে নেমেছি। মক্তব আর হেফজখানা যেখানে পড়েছি, পরবর্তীকালে সেখানে কিতাব বিভাগ হলেও আমাদের তখনকার সময়ে ছিল না। আর ছিল না বলেই কিতাব বিভাগের উন্মুক্ত পাঠশালা, বড় বড় কিতাব, হিজিবিজি আঁকাবাঁকা হরফের কিছুই আমি ইতোপূর্বে দেখিনি। তাই এখানে আসামাত্রই এ যে এক বিস্তৃত গহীন সাম্রাজ্য; তা বুঝতে আমার খুব একটা বেগ পেতে হলো না।


কিতাব বিভাগে ভর্তি হওয়ার আগে ভাবতাম এ-ও বুঝি হেফজখানার মতোই দীর্ঘ একটা কোর্স। আলাদা কোন শ্রেণির বিভাজন এখানে নেই। কিন্তু ভর্তি হওয়ার পরেই দেখি একের পর এক শ্রেণির বিভক্তি এবং সে-সব শ্রেণির সর্বনিম্নে আমার স্থান। ইবতেদায়ী আওয়াল থেকে শুরু করে দাওরা পর্যন্ত যেতে হলে একে একে দশটা সিঁড়ি আমায় চড়তে হবে। তবে মাঝখানে পা ফসকে গেলে এর লজ্জা অপমান তিরস্কার এবং গ্লানিবোধ–সবই আমার একার। 


আমাদের রুমের সামনের রুমটাই ছিল দাওরায়ে হাদীসের। দাওরা আর আমাদের রুমের মাঝে দুই-তিন হাতের ছোট্ট একটা করিডোর। একটুখানি উঁকি দিলেই সেখানের সকাল-সন্ধ্যা দেখা যায়৷ দুটো পা এগিয়ে গেলে সেখানে ঢুকে বসেও থাকা যায়। তাই মুখোমুখি হওয়ার কারণে আমাদের অনেকেই সময়ে-অসময়ে ওখানে গিয়ে আড্ডা দিত৷ গল্প করত। কিন্তু ঢুকতে পারতাম না আমি নিজেই। ওই দরজার সামনে দাঁড়ালেই আমার কেমন ভয় করত। বারেবারে প্রিয় নবিজির (সা.) শানে দরূদ পড়তাম। কেননা, আমি বিশ্বাস করতাম, এখানে প্রবেশের জন্য যতটুকু ভাগ্যের প্রয়োজন, অতটুকু ভাগ্য এই পাপিষ্ঠের নেই।


আমাদের প্রিয় শিক্ষক মাওলানা আবুবকর মুহাম্মদ আদনান সাহেব (হাফিযাহুল্লাহ) ছিলেন তৎকালীন কুতুবখানার দায়িত্বশীল। কিতাবাদির পরিচর্যায় তিনি প্রায়ই আমাকে কুতুবখানায় নিয়ে যেতেন। উপরের সব ক্লাসের কিতাবই ছিল আমার কাছে নতুন৷ কিন্তু হাদিসের কিতাবগুলোর প্রতি আমার বিশেষ রকমের ভক্তি কাজ করত। এমন ভালোবাসা নিয়ে সেগুলোর দিকে তাকিয়ে থাকতাম, যতটুকু থাকলে চক্ষু শীতল হয়। ছোঁয়ার প্রয়োজন পড়ে না। 


কিতাবগুলো গোছাতে গিয়ে সবার থেকে আড়াল করে আমি চোখের পানি ফেলতাম। ওগুলো ধরতে পারার আনন্দ এবং পড়তে পারার আকুতি মিলেমিশে একাকার হয়ে যেত বুকের ভেতর। তাই কাজ করতে গিয়ে রক্তমাংসের স্থূলদেহে অবসাদ নেমে এলেও আমি ক্লান্ত হতাম না। হাদীসের প্রতি আমার ভালোবাসাই হয়তো আমাকে সেই শক্তি যোগাত। 


দেখতে দেখতে দিন চলে গেল। প্রতি বছর রোজার ঈদের পর শাওয়ালের শুরুর দিকে আমাদের ভর্তি হতে হয়৷ বরাবরের মতো ভর্তি হতে গিয়ে হঠাৎ লক্ষ্য করে দেখি আমি এবার দাওরায় ভর্তি হতে এসেছি। এসেছে ভর্তিচ্ছুক আরো অনেকে। তাদের পেছনে দাঁড়িয়ে দীর্ঘক্ষণ অপেক্ষার প্রহর গোনার পর অবশেষে এলো আমার পালা। ভর্তির যাবতীয় কার্যক্রম শেষে টাকা জমা দিতে যাওয়ার সময় গলাটা অসম্ভব ভারি হয়ে উঠল। চোখদুটো ভিজে এলো নিমিষেই। এত মানুশের মাঝে কেউ দেখে ফেললে নির্ঘাত শোর বেঁধে যাবে৷ তাই নিজেকে সংবরণ করে অপরাধীর মতো নতমুখে আমি বেরিয়ে পড়লাম।


আমি ভাববাদী মানুশ। খালি চোখের অনেক বাস্তবতা আমার কাছে অবাস্তব মনে হয়৷ যা দেখি না, তার প্রতি আমার অগাধ বিশ্বাস। তাই চোখের সামনে ঘটতে থাকা এই ঘটনা খুব সহজে আমার বিশ্বাস হচ্ছিল না। উপমহাদেশে দাওরা পাশ করলেই মাওলানা হওয়া যায়। পড়ালেখার একটা গ্রহণযোগ্য স্তর মনে করা হয় দাওরায়ে হাদীসকে। কোনমতে এখান থেকে শেষ করে বেরোতে পারলেই আমাদের সমাজ তাকে মাওলানা ভেবে নিয়ে মাথায় করে রাখে। আমার মতো মেধাহীন নাফরমান সেখানে ভর্তি হতে এসেছে এবং সহিহ সালামতে শেষ করে বেরিয়ে পড়তে পারলেই মাওলানা হয়ে যাবে, এ আমার কাছে সত্যিই অবিশ্বাস্য মনে হচ্ছিল। 


গতকাল দাওরার প্রথম ক্লাস করলাম। হাদীসের জগতে আরো আগেই প্রবেশ করলেও আজকের দিনটা ছিল আমার জন্য সবিশেষ আনন্দের দিন। আমার শরীরে প্রবাহিত রক্তের প্রতিটি কণিকায় ছিল পরম করুণাময়ের কাছে টিকে থাকার আকুলতা। জানি না সেসব কবুল হলো কিনা। তাই ভীত এবং আতঙ্কের চোখে তাকাই। সুন্নাতে নববির সবুজ ছায়ায় আশ্রয়ের ফরিয়াদ জানাই। 


২০.০৫.২০২২ ইং, রোজ শুক্রবার

রাত ১১:১৯ মিনিট।




মন্তব্যসমূহ

এই ব্লগটি থেকে জনপ্রিয় পোস্টগুলি

এমন দরদি মালী কোথায় পাব খুঁজে

মাদকঃ একটি আলোকচিত্র

জলের গান