কুরবানির মর্মকথা


আমরা যেবার প্রথম কুরবানি করি, তখন আমার বয়স আনুমানিক ছয় কি সাত৷ ঈদেরদিন সকালে আম্মু আমাকে ঘুম থেকে ডেকে ওঠালেন, “বারান্দায় গিয়ে দেখ, তোমার আব্বু একটা ছাগল এনেছে কুরবানির জন্য“। আমি একলাফে বিছানা থেকে নামলাম। বারান্দায় গিয়ে দেখি একটা ছাগল থামের সাথে বাঁধা। ছাগলটা ছোট, আমার বয়েসও কম–এজন্যই কিনা জানি না, ওর উপর আমার খুব মায়া পড়ে গেল। আমি বায়না ধরলাম– এটাকে আমরা কুরবানী দেব না, লালনপালন করে বড় করব৷  


যেই ভাবা সেই কাজ। নামাজের পর আব্বু নানাভাইকে প্রস্তুত হয়ে আসতে বললেন কুরবানির জন্য; তাঁরই জবাই করার কথা৷ অথচ আমি বেঁকে বসলাম। একে আমি মোটেও কুরবানি করতে রাজি নই। একে পালব, এবং এটাই আমার চূড়ান্ত কথা। তাই নানাভাইকে নামাজের পরে আর আসতে হবে না বলে নিষেধ করে দিলাম। 


এখানে আমার অস্থির সময় কাটতে লাগল। এই ‘অবুঝ বাচ্চা’ ছাগলটাকে আমরা কী করে জবাই করব? ও তো খুবই ছোট এবং নিরীহ একটা প্রাণী। ওকে জবাই করতে কি একটুও খারাপ লাগবে না আব্বুর? জবাই যদি করেও ফেলা হয়, খাওয়ার সময় তো আমাদের বিবেকে বাঁধার কথা, নাকি? আব্বু এত নির্দয় আর পাষণ্ড কী করে হতে পারেন, ভেবে ভেবে আমি এর কূলকিনারা করতে পারলাম না। আমার যাবতীয় আবদার অনুরোধ আর কান্নাকাটিকে উপেক্ষা করে, শত কাকুতিমিনতির কোন তোয়াক্কা না করেই আব্বু আর নানাভাই ছাগলটাকে জবাই করে ফেললেন। তাঁরা কেন এমনটা করলেন, সেই ক্ষোভ আমাকে কৈশোরের অনেকটা সময় ধরে বিষিয়ে রেখেছিল। 


গরুর বাজারদর এবারের ঈদে (১৪৪৩ হি./২০২২ ঈ.) ওলোটপালোট হয়ে যাওয়ায় অনেক অনেক বছর পর আবারো আমরা খাসি কুরবানি করলাম। বলা বাহুল্য, এই খাসিটার ওপরেও আমার সেই একই মায়া পড়ে গেল। সেবারের মতো এবারও কুরবানির আগের রাতে মনটা জোরেসোরে মোচড় দিয়ে উঠল। খাসিটার অবুঝ চাহনি বারেবারে মনে দোল দিয়ে উঠতে লাগল। অল্প কিছুক্ষণের সঙ্গ আমাদের মধ্যে ভালোবাসার এক অদৃশ্য রেখা টেনে দিয়েছিল। দেখা গেল, আমি ছাড়া আর কেউ ওর দড়ি ধরে টানতে চাইলে ও একেবারেই থেমে গেছে। অনেক গুতাগুতি করেও ওকে জায়গা থেকে টলানো যাচ্ছে না। অথচ দড়িটা আমার হাতে নিলেই ও আবারো চলতে শুরু করেছে। কোথাও আটকাচ্ছে না৷ 


জবাই করা শেখার পর বহু বছর ধরে আমাদের কুরবানির পশু আমাকেই জবাই করতে হয়। ছোটভাই কখনো কুরবানি করেনি। এবার খাসি জবাইয়ের মাধ্যমে ও শেখা শুরু করতে চায় বলে আবদার করল। আমিও মূহুর্তেই রাজি হয়ে গেলাম। যেন বড় কোন দুঃখ এবং গ্লানিবোধ বয়ে বেড়াতে হচ্ছে না বলে আমার ভালোই হলো। দেখতেই দেখতেই আল্লাহু আকবারের সুরে জবাই হয়ে গেল আমাদের ছাগলটা। জবাইয়ের পর বুকের পথ হয়ে উঠে আসতে চাইল একটা কান্নার কলরোল। কিন্তু অবুঝ বাচ্চাটি নই বলে জনসমাগমের মধ্যে নিজেকে সংবরণ করতে হলো। বুকের কান্না রয়ে গেল বুকেরই ভেতর। কেউ দেখল না। কেউ জানল না।


শিশু ইসমাইলকে (আ.) কুরবানি করতে আদিষ্ট হয়েছিলেন আল্লাহর হাবীব সাইয়্যিদুনা হযরত ইবরাহীম (আ.)। বৃদ্ধকালে দয়াময়ের আশির্বাদ হিসেবে পাওয়া কলজের টুকরোকে কুরবানির নির্দেশ করার পেছনের রহস্যটাও ছিল এই একটিই। তা হলো মায়াকে বিসর্জন দেওয়া। এই বিসর্জন হতে হয় সেই অমুখাপেক্ষী রবের তরে, যার কাছে গোটা দুনিয়ার সবকিছু নস্যি; সবকিছু তুচ্ছ। যার কাছে গোটা দুনিয়া এবং এর ভেতর-বাহির একটি মৃত মশা কিংবা মাছির কেটে যাওয়া ডানার সমতুল্যও নয়।  


সবকিছু ভুলে সন্তুষ্ট এবং দ্বিধাহীন চিত্তে আমরা আল্লাহর দিকে যেন রুজু হতে পারি, সেজন্যই মায়ার বস্তুটাকে কুরবানি করতে আমাদেরকে আদেশ করা হয়েছে। একটু গভীর আর তাত্ত্বিকভাবে ব্যাখ্যা করলে দেখা যায় এর স্বরূপ বাস্তবতা। বেরিয়ে আসে ভিন্ন সুরঙ্গপথ। অসীম দয়ালু সেই পরম করুণাময়ের সাথে একাত্ম হতে হলে মাটির মানুশের পক্ষ থেকে যেসব বাঁধা-বিপত্তি কিংবা প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি হতে পারে, তাঁর রজ্জু ধরে মহাশুন্যে উঠে যাওয়ার ক্ষেত্রে কাদামাটির মানুশ যেসব অদৃশ্য মায়ার বাঁধনে আটকা পড়তে পারে, সেসব বাঁধন ছিন্ন করার নামই বোধহয় কুরবানি৷ নতুন হাঁটা শেখা বাচ্চারা পড়ে গেলে দূরে দাঁড়ানো বাবা-মা যেভাবে ডাকেন শরীরের ময়লা ঝেড়ে উঠে আসতে, যেন সেভাবেই দূরে দাঁড়িয়ে ডাকেন দয়াময়। ডাকেন, আত্মার সব ধুলোময়লা ঝেড়ে তাঁর দিকে মনোনিবেশ করতে৷ 


সাইয়্যিদুনা হযরত ইবরাহীমকে (আ.) যেভাবে প্রিয়পুত্রকে কুরবানির সিদ্ধান্ত নেওয়ার মাধ্যমে অগ্নিপরিক্ষা দিতে হয়েছিল, তার ছিঁটেফোঁটা সামান্যটুকুও আমাদের উপর আপতিত হয়নি। অল্পকিছু মূল্যের বিনিময়েও যদি হযরত ইবরাহীম আ.-এর মহান ত্যাগের ছায়ায় আশ্রয় নেওয়া যায়, এরচেয়ে আনন্দের আর কী হতে পারে! সামান্য ত্যাগ এবং কুরবানির মাধ্যমে যদি জগতসমূহের সৃষ্টিকর্তার সন্তুষ্টি অর্জনের একটা অজুহাত পাওয়া যায়, এরচেয়ে খুশির আর কী হতে পারে! 


রাত ১২:১৮ মিনিট

১৩ ই জুলাই, ২০২২ ইং, বুধবার

মন্তব্যসমূহ

এই ব্লগটি থেকে জনপ্রিয় পোস্টগুলি

এমন দরদি মালী কোথায় পাব খুঁজে

মাদকঃ একটি আলোকচিত্র

জলের গান