আমার কথাঃ তোমায় মনে পড়ে মা গো! তোমায় মনে পড়ে!

খুব ভোরে আঁধার মিলিয়ে যাবার আগেই আজ আমরা বেরিয়ে পড়ি। সেই সকাল থেকেই ঝিরিঝিরি বৃষ্টি‌ আর বাদলা হাওয়ার দৈত সমীরণে ব্রহ্মপুত্রের বুকে ভেসে চলছে আমাদের ত্রাণ বোঝাই ট্রলার। অবিরত বর্ষণে দিগন্তের সবুজকে আজ ঝাপসা দেখাচ্ছে।

উপরের ঘোলাটে আর্দ্র আকাশ, নিচে অন্ত্যহীন-বিস্তৃত দরিয়ার হাতছানি এবং ভরা যৌবনা ব্রহ্মপুত্রের রূপ-সৌন্দর্য! অথচ এসবের কিছুই আমার মন  ভোলাতে পারছে না। মন পড়ে আছে সেই সুদূর-আকর্ষণী আমার আম্মুর কোলে। আজকের এই দিনে, যে দিন বছরে একদিনেই এসে একদিনেই চলে যায়, সেই দিন আমার আম্মু-আব্বুর স্পর্শহীন বিদায় নেয়নি কখনো। অথচ আজ আমি আম্মু-আব্বু থেকে চারশো কিলো দূরের বন্যাঞ্চল কুড়িগ্রামে সফররত।

আজকের ঘন বর্ষণ আমার স্মৃতিতে জাগিয়ে তোলে একটি বৃষ্টিভেজা মধ্যদুপুরের কথা।১৯৯৭'র ৭ই জুলাই, বেলা বারোটা৷ আজকের মতো সেদিনও ছিলো প্রবল বৃষ্টির দিন৷ নদীর পানিতে আমাদের ট্রলার ভেসে চলার মতো আমার মস্তিষ্কে ভেসে বেড়ায় তেইশ বছর পূর্বেকার আমার যুবতী এবং প্রসূতি মায়ের কথা। আজ চারশো কিলো দূরত্বের এই সফরে আম্মুকে একটু দেখার আকুলতার মতো সেদিনও বুঝি আমাকে একটু দেখার  পিপাসায় কাতরে উঠছিলো আম্মু। আম্মুর মুখে শুনেছি সেদিনকার পিপাসায় যাতনা ছিলো কতো! হাসপাতালে নিয়ে যাবার সময় দোকানের চাল বেয়ে টপকে পড়া পানি খেতে চাইছিলো আম্মু। আপাকে (নানিকে)  বলছিলো, ওখান থেকে পানি এনে দাও না মা! আমার খুব পিপাসা লাগছে!

আম্মুর সেদিনকার তৃষালু অসহায়তা আমায়ও তৃষিত করে তোলেছে আজ। পানিপথের এই সফরে চোখের সামনে অবারিত বন্যা আর ব্রহ্মপুত্রের সংমিশ্রণে যে বিস্তৃত জলরাশি, তার সবটুকু এনে গলায় ঢেলে দিলেও হয়তো আমার দুর্নিবার তৃষ্ণা মিটবার নয়! এ যে আমার প্রাণের তৃষ্ণা, পানিতে কি মেটানো যায়?

কাজ শেষে আম্মুকে ফোন করে বললাম, তোমাকে খুব মনে পড়ছে আম্মু!পাল্টা জবাবে আম্মু বললো, তোমাকেও তো খুব মনে পড়ছে বাবা! এই মধুর সম্বোধন আমার আকণ্ঠ জড়িয়ে ধরলো। বললাম, তোমাকে তো কতো কষ্ট দেই, কতো কীই বলি, তুমি মাফ করে দিও! আম্মু বললো, বাবা মা কখনো সন্তানের উপর রাগ করে থাকতে পারে না। দশ পনেরো মিনিট পরে আবার যেই সেই হয়ে যায়! থাক, তুমি মন খারাপ করো না! ভালো  থেকো, নিজের যত্ন নিও! তুমি আসার পরে ভালো কিছু রান্না করবো! তুমি সহিহ সালামতে আসো আগে!

কথাগুলোয় চোখ ভিজে এলো, কণ্ঠ জড়িয়ে হৃদয় শুকিয়ে গেলো। বলার আর বাকি রইলো না কিছুই।

আমার এই লেখা যেই পড়ছেন, তাকে বলছি হে প্রিয় পাঠক! আমার আব্বু আম্মুর নেক হায়াত ও আফিয়াতের জিন্দেগী কামনায় দয়া করে হাত তুলবেন! যাদের উসিলায় দীর্ঘ তেইশ বছর যাবৎ উপভোগ করছি পৃথিবীর আলো-বাতাস, তাঁদেরকে যেনো দয়াময় নিজ হাতে আবাদুন আবাদ জান্নাতুল ফিরদাউসের দ্বারা সম্মানিত করেন! দুয়া থাকবে দুয়াকারীর জন্যও, আল্লাহ আপনার মনের নেক বাসনা পূর্ণ করুক!

- ইসহাক নাজির,
- ০৯/০৭/২০২০ইং, রোজ বৃহস্পতিবার।

মন্তব্যসমূহ

এই ব্লগটি থেকে জনপ্রিয় পোস্টগুলি

এমন দরদি মালী কোথায় পাব খুঁজে

মাদকঃ একটি আলোকচিত্র

জলের গান